কৈশোরের প্রেম ৪র্থ পর্ব

Social Share

এবার ফেরার পথে চলনবিল যাদুঘর দেখার পালা। গাড়িতে ওঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই চলনবিল যাদুঘরের সামনে নামলো। চলনবিল যাদুঘর গুরুদাসপুরবাসী তথা বাংলাদেশীদের এক অমূল্য সম্পদ। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর খুবজীপুর দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ভবনে অধ্যাপক এম. এ. হামিদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় অস্থায়ীভাবে যাত্রা শুরু হয় চলনবিল যাদুঘরের। ১৯৮৯ সালের ২ জুলাই যাদুঘরটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় আসে। এখানে রয়েছে হাতে লেখা কোরআন শরীফ, মহারাণী ভবানীর হাতে লেখা দলিল, চলনবিল অঞ্চলের মানুষের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্র, দূর্লভ পূরাকীর্তি, নানান ধরনের মূর্তি আর মুদ্রা। এখানে রয়েছে বাদশা আলমগীর ও সম্রাট নাসিরুদ্দিনের নিজ হাতে লেখা দুটি কোরআন শরীফসহ পুরনো তুলোট কাগজে হাতে লেখা চার’শ বছরের পুরনো ৮টি সম্পুর্ণ ও ৭ টি আংশিক কোরআন শরীফ, ১৫টি হাদিস শরীফসহ ২৫৭টি ধর্মগ্রন্থ, কষ্টি পাথরের সূর্যদেব, বিষ্ণু ও অন্যান্য দেবদেবীর মূর্তি, ৯০ টি দেশের মূদ্রা, বিভিন্ন ধরনের ঘট ও পাত্র, বিভিন্ন শাসন আমলের টেরাকোটা। এ সমস্ত জিনিসপত্র সবাই অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে দেখলো। এ সময় আর একবার শামিম ও শিফা দুজন একত্রিত হওয়ার সুযোগ পেল। এ স্বল্প সময় যেন দুজনের কাছে মহা মূল্যবান। তারা কিছুতেই এ সময়টুকু অন্য কারো সাথে শেয়ার করতে চাইলো না। সকলের সন্দেহের ঊর্ধ্বে থাকার জন্য শামিম তার সঙ্গে রফিককে এবং শিফা বুদ্ধি করে জেসমিনকে কাছে রাখলো। তারা পাশাপাশি থেকে চলনবিল যাদুঘর দেখা শেষ করল। এ যাদুঘরের কয়েক’শ গজ ফাঁকেই রয়েছে চার’শ বছরের পুরোনো এক বটগাছ। এ বটগাছ দেখার জন্য সবাই অধীর আগ্রহে পদব্রজে যাত্রা শুরু করলো। শামিম, শিফা, রফিক , জেসমিন পাশাপাশি একত্রে হেঁটে খুবজীপুর হাই স্কুলের মাঠ পার হতে থাকলো। শামিম ও শিফা দুজনেই মনের মধ্যে এক অকল্পনীয় পুলক অনুভব করছিল। তাদের মনে হচ্ছিল আজকের এই পথচলা যদি কখনো শেষ না হতো তবে কতই না মজা হতো। কিন্তু দেখতে দেখতে কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা সেই পুরনো বটগাছের নিচে পৌঁছে গেল। সবাই অবাক হয়ে দেখলো সেই চার’শ বছরের পুরনো বটগাছ। দেখতে দেখতে সূর্য ডুবে এলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাঠ পেরিয়ে আবার গাড়ির কাছে এলো সবাই। এবার শামিম ও শিফা দুজনের দুই গাড়িতে ওঠার পালা। ভাবতেই শামিমের মনের মধ্যে কেন যেন এক বিষন্নতার মেঘ জমতে শুরু করলো। কারণ কিছুক্ষণ পরেই বাড়িতে পৌঁছার পর আর এমন আন্তরিক পরিবেশে এত ঘনিষ্ঠভাবে কাছাকাছি আসার সুযোগ হবেনা দুজনের – এ কথা ভাবতেই শামিমের মন আবার কিছুটা অস্থির হয়ে উঠলো। গাড়িতে ওঠার পর শামিমের মনে হচ্ছিল গাড়ি যেন সন্ধ্যার ঈষৎ আঁধার ভেদ করে রকেটের বেগে ছুটছে। চোখের পলকে গাড়ি স্কুল গেটে পৌঁছে গেল। এবার শামিম রফিককে সাথে নিয়ে শিফার কাছে এলো। তারপর শামিম, শিফা, রফিক ও জেসমিন এক সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে শিফাদের বাসার গেট পর্যন্ত এল। সেখান থেকে বসায় ফিরে যেতে শামিমের যেন মন চাইছিল না। পরিশেষে, সন্ধ্যার মৃদু আলোতে শিফার হাসিমুখ দেখে শামিম বিদায় নিল।

প্রতিদিন শিফার মুখ দেখার জন্য শামিমের মন যেন ব্যাকুল হয়ে থাকত। তাই ক্লাস থাকুক বা না-ই থাকুক প্রতিদিন বিকেলে সে একবার করে শিফাদের বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে সাইকেল নিয়ে ঘুরে আসতো। যতই দিন যেতে থাকলো শামিম ও শিফার মধ্যে বন্ধুত্বের বন্ধন দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হতে থাকলো। দেখতে দেখতে ক্লাস নাইনের ফাইনাল পরীক্ষার তারিখ ঘোষনা করা হলো। সবাই পড়াশুনায় ব্যস্ত হয়ে পড়লো। পরীক্ষায় কিছুদিন আগে থেকে শিফার সাথে শামিমের দেখা সাক্ষাত কিছুটা কম হতো। তাই এ দিন গুলোতে শামিমের মন কিছুটা চঞ্চল থাকতো। ফাইনাল পরীক্ষাতে তারা দুজনেই ভালো রেজাল্ট করলো। ক্লাস টেনের নিয়মিত ক্লাস শুরু হবার পর শামিম যেন স্বস্তি ফিরে পেল। এ সময় দুজনের মধ্যে ক্লাস ও প্রাইভেট পড়ার সময় দেখা সাক্ষাত ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে নোট আদান-প্রদানসহ বিভিন্ন অজুহাতে দেখা-সাক্ষাত হতো। এসএসসি প রী ক্ষাকে সামনে রেখে সকলেই পুরোদমে গভীর উদ্যোগের সাথে পড়াশুনা শুরু করলো। কিন্তু শামিমের মনের মধ্যে কিসের যেন এক উদ্বিঘ্নতা মাঝে মাঝেই তাড়া করতো। সে ততটা মনোযোগের সাথে পড়াশুনা করতে পারত না। বিষয়টি সে কারো সাথে শেয়ার করতেও পারতো না। বছরের বিভিন্ন ধরনের বিশেষ দিনগুলোতে শামিম শিফার কাছাকাছি থাকতো বিধায় এ সময়গুলো তার খুব সুন্দর ভাবে হাসি খুশিতে কাটতো। স্বাধীনতা দিবস, ১ লা বৈশাখ, ২৫ শে বৈশাখ, ১১ ই জৈষ্ঠ, বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, বার্ষিক মিলাদ মাহফিল, সরস্বতী পূজা, বিজয় দিবস – এ সমস্ত দিনগুলো শামিম ও শিফার খুব সুন্দর ভাবে কেটে গেল। সামনেই সপ্তাহব্যাপি বিজ্ঞান মেলা শুরু হবে। এ বাবের বিজ্ঞান মেলায় শামিমদের গ্রুপই নেতৃত্ব দেবে। তাই আসিফ, শামিম, রফিক, রবিন, রায়হান, শিফা, জেসমিন, রোকেয়া ও শায়লা সবাই একত্রে পরিশ্রম করে বিজ্ঞান মেলার জন্য প্রজেক্ট তৈরি করছিল। অবশেষে সেই বিজ্ঞান মেলা উদ্বোধনের দিন এগিয়ে এলো। উদ্বোধনের আগের দিন আসিফ, শামিম, শিফা, রফিক, জেস মিন, রবিন, রায়হান একত্রে রাত আটটা পর্যন্ত তাদের স্টল শাজালো। সাথে বিজ্ঞানের শিক্ষক আব্দুস সাত্তার ও শ্যাম সুন্দর সাহা উপস্থিত থাকলেন। অত্যন্ত আনন্দের সাথে তারা সবাই মিলে স্টল সাজালো। পরদিন মেলার উদ্বোধন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার রেজাউল করিম তরফদার সাহেব বিজ্ঞান মেলার উদ্বোধন করবেন। সাথে শিফার বাবাও থাকবেন। এছাড়া মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারসহ উপজেলা পর্যাযের বিভিন্ন অফিসার ও গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ থাকবেন। সকাল হতেই শামিম , শিফাসহ অন্যান্য সকলেই সেজে গুজে অনুষ্ঠান শুরু হওযার প্রায় এক ঘন্টা পূর্বে স্কুলে উপস্থিত হলো। সেদিন ক্লাস টেনের সকল ছাত্রী লাল পারের সবুজ শাড়ি পড়ে স্কুলে এলো। শাড়ি-ব্লাউজ ও স্বর্ণালঙ্কারে সজ্জিত শিফাকে অপূর্ব দেখাচ্ছিল। মাথার ওপর ও কানের পাশ দিয়ে বুক অবধি ঝুলে থাকা রজনীগন্ধার মালা,আর কানের ওপর লাগানো সাদা জাবেরা ফুল, শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে পড়া সবুজ পাতার মত টিপ, চোখে আঁকা কালো কাজল, গোলাপি পদ্মের পাপড়ি-রাঙা লিপ্সটিক আর অকৃত্রিম সৌন্দর্যে ভরা মুখে শিফাকে যেন সৌন্দর্যের দেবী বলে মনে হচ্ছিল। সকল কাজের মাঝেও শামিম কারণে অকারণে বারবার শিফার দিকে তাকাচ্ছিল। তাকে দেখার তৃষ্ণা যেন কিছুতেই মিটছিল না শামিমের। অনুষ্ঠান উদ্বোধনের সময় হয়ে এলো। সবাই গেটের সামনে সমবেত হলো। এরপর এক পর্যায়ে প্রধান অতিথি হিসেবে উপজেলা নির্বাহী অফিসার অনুষ্ঠান স্থলে উপস্থিত হলেন। শিফা তাকে ফুলের তোড়া দিয়ে অভ্যর্থনা জানালো। তিনি ফিতা কেটে বিজ্ঞান মেলার উদ্বোধন করলেন। এক এক করে সকল স্টল ঘুরে ঘুরে দেখলেন। সেদিন অত্যন্ত ফুরফুরে মেজাজে সারাটা দিন কেটে গেল শামিমের। বাড়িতে ফেরার পর শিফার শাড়ি পরিহিত মুখটি বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। তাই সেদিন রাতে ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে সে শিফাকে তার নব বিবাহিত স্ত্রী রূপে দেখতে পেল। ঘুম ভাঙতেই শামিমের মন সীমাহীন তৃপ্তিতে ভরে গেল। খুশিতে খুশিতে বিজ্ঞান মেলার সাতটি দিন দেখতে দেখতে কেটে গেল। বিজ্ঞান মেলা শেষে কয়েক দিন পরেই বিজয় দিবস এলো। সেদিনও তাদের দু’জনের বেশ আনন্দেই কাটলো।
এর তিন দিন পরেই টেস্ট পরীক্ষা শুরু হলো। টেস্ট পরীক্ষা শেষ কয়েক দিন পরেই নাটোর উত্তরা গণভবনে শিক্ষা সফরের তারিখ নির্ধারিত হল। শামিম ও শিফা দু’জন এই প্রথম কোথাও একত্রে স্বাধীনভাবে ঘুরতে যাবে। এ কথা ভাবতেই শামিমের মনে আলাদা এক অনুভুতির সৃষ্টি হল। কয়েক দিন আগে থেকেই দু’জন মনের মধ্যে নতুন নতুন পরিকল্পনা করতে শুরু করলো। অবশেষে বহুল প্রত্যাশিত দিন আসলো। এবার শিক্ষা ভ্রমণের জ ন্য একটি মাত্র কোচই ভাড়া করা হয়েছে। কাজেই একই গাড়িতে শিফার কাছাকাছি ভ্রমণ করা সম্ভব। তাই সেদিন খুব সকালে স্কুলে এসে সে শিফার পাশাপাশি সিটে বসার বুদ্ধি আঁটলো। অবশেষে, শিফার সিটের-পাশের রো-তে শামিম তার সিটের দখল নিল। রাস্তায় দু’জন দু’জনের চোখে রেখে গল্পে গল্পে সময় কাটিয়ে দিল। ঘন্টা খানেকের মধ্যেই কোচ উত্তরা গণভবনের গেটে পৌঁছে গেল। সেখানে পৌঁছেও সব সময়ই তারা দু’জন পাশাপাশি থাকলো। তাদের দু’জনের সাথে যোগ দিল রফিক ও জেসমিন। উত্তরা গণভবন বা দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি আঠারো শতকে নির্মিত দিঘাপতিয়া মহা রাজাদের বাসস্থান। নাটোর শহর থেকে ২.৪কি.মি. উত্তরে এক মনোরম পরিবেশে এর অবস্থান। ১৯৭২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দিঘাপতিয়া রাজবাড়িকে উত্তরা গণভবন নামকরণ করেন।
(চলবে)