কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর (৩৫) মৃত্যুর পর তাঁর মা-বাবা, স্ত্রী ও স্বজনরা হতবাক। বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতজন সামাজিক মাধ্যমে তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন হৃদয়স্পর্শী পোস্ট দিচ্ছেন। গতকাল রোববার কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে বুলেট বৈরাগীর মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে।
এরপর সেখান থেকে মরদেহ নিয়ে স্বজনরা রওনা হয়েছেন গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়। মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে বুলেট বৈরাগীর স্ত্রী ঊর্মি হীরা বললেন, ‘অন্য কিছু জানতে চাই না আমি।
একটাই জানতে চাওয়া, আমার স্বামীর সঙ্গে কী ঘটেছিল? সেটা একবারের জন্য জানতে চাই।’ প্রযুক্তিগত তদন্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রাথমিকভাবে বুলেট বৈরাগীর মতো একজন মেধাবী তরুণ সরকারি কর্মকর্তার মৃত্যুর কারণ নিয়ে যে তথ্য পেয়েছে, তা জানতে পারলে কীভাবে নিজেকে সামলাবেন ঊর্মি হীরা। গতকাল রোববার পর্যন্ত হত্যার কারণ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু প্রকাশ করেনি। তবে তদন্তের সঙ্গে যুক্ত একাধিক সূত্র গতকাল রোববার রাতে সমকালকে জানিয়েছে, এই খুনের সঙ্গে জড়িত পাঁচ সদস্যের একটি পেশাদার ছিনতাইকারী চক্র। যাত্রী সেজে ফাঁদ পেতে তারা বুলেটের জীবন কেড়ে নেয়। জড়িত সবাই কুমিল্লার কোতোয়ালি থানার বাসিন্দা। বুলেট বৈরাগীকে খুন করা হয়েছে। এটি কোনো দুর্ঘটনা ছিল না।
সামান্য কিছু জিনিসপত্র বুলেট বৈরাগীর কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়ে তাঁকে গাড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে মেরে ফেলতে এতটুকু হৃদয় কাঁপেনি জড়িতদের! পুরো চক্রটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র বলছে, বুলেট বৈরাগীকে হত্যার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে যে পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে তারা হলেন– কোতোয়ালির আমড়াতলী এলাকার বাসিন্দা ইমরান হোসেন হৃদয় (৩৭), একই এলাকার মোহাম্মদ সোহাগ (৩০), ইসমাইল হোসেন জনি (২৫), মোহাম্মদ সুজন (৩২) ও রাহাতুল রহমান জুয়েল (২৭)।
হত্যার সঙ্গে জড়িত চক্রের সদস্যরা বুলেট বৈরাগীর কাছ থেকে মোবাইল ফোনসেট, ব্যাগ, ক্যামেরা ও অল্প কিছু টাকা ছিনিয়ে নিয়ে নির্দয়ভাবে চলন্ত সিএনজি অটোরিকশা থেকে ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দেয়। প্রচণ্ড আঘাতজনিত কারণে মারা যান তিনি। কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় গতকাল রোববার অভিযান চালিয়ে এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে তারা। বুলেট বৈরাগীর কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া মোবাইল ফোনসেটসহ বেশ কিছু জিনিসপত্র তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
কুমিল্লা নগরের রাজগঞ্জ পানপট্টি এলাকায় আটতলা ভবনের একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতেন কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। চট্টগ্রাম থেকে গত শুক্রবার রাতে কুমিল্লার বাসায় ফিরছিলেন তিনি। কাছাকাছি স্থানে পৌঁছে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একাধিকবার কথাও বলেছিলেন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত আর বাসায় ফেরা হয়নি তাঁর। শনিবার সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকার আইরিশ হিল হোটেলের পাশে ওই কাস্টমস কর্মকর্তার মরদেহ মিলেছে। তাঁর মরদেহের মাথার পেছনের অংশ ও মুখমণ্ডলে রক্তাক্ত চিহ্ন ছিল।
বুলেট বৈরাগী গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া গ্রামের বাবুপাড়া এলাকার বাসিন্দা সুশীল বৈরাগীর ছেলে। তিনি ৪১তম বিসিএস নন-ক্যাডার পদে কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট বিভাগে যোগদান করেন। এরপর সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন কুমিল্লার বিবিরবাজার স্থলবন্দরে। ১ এপ্রিল বিবিরবাজার থেকে চট্টগ্রামে গেছেন ৪৪তম বুনিয়াদি প্রশিক্ষণে। চাকরির সুবাদে তিনি কুমিল্লা নগরের রাজগঞ্জ পানপট্টি এলাকার ওই ভাড়া বাসায় থাকতেন। নিহত বুলেট তাঁর মা-বাবার একমাত্র সন্তান।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র সমকালকে জানায়, তথ্যপ্রযুক্তিগত তদন্ত ও সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শুক্রবার রাত ১০টার দিকে চট্টগ্রামের দামপাড়া থেকে সেন্টমার্টিন ইয়াসিন এক্সপ্রেসে ওঠেন বুলেট বৈরাগী। রাত পৌনে ৩টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোতোয়ালি থানাধীন হোটেল রোডস্টারে গাড়ির যাত্রাবিরতির সময় নেমে পড়েন তিনি। এরপর কুমিল্লার পানপট্টি এলাকার নিজের বাসায় যেতে জাগর ঝুলি নামক স্থান থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠেন। চালকসহ ওই সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আগে থেকে পাঁচজন ছিল। ছদ্মবেশে যাত্রী হিসেবে থাকা ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যরা ভয়ভীতি দেখিয়ে তাঁর কাছ থেকে মোবাইল ফোনসেট, ব্যাগ, ক্যামেরা ও পায়ে থাকা জুতা হাতিয়ে নেয়। এরপর তাঁকে চলন্ত গাড়ি থেকে রাস্তায় ফেলে দেয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, রোববার কুমিল্লা রেলস্টেশন এলাকা থেকে প্রথমে সোহাগকে আটক করা হয়। এরপর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কুমিল্লার কোতোয়ালির বিবিরবাজার এলাকা থেকে আরও দুজনকে আটক করা হয়েছে। বুড়িচং থানাধীন এরশাদ ডিগ্রি কলেজের সামনে থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা জব্দ ও তার চালককে আটক করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বুলেট হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শনিবার রাতে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় হত্যা মামলা করেছেন মা নীলিমা বৈরাগী। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। এই মামলায় আটক পাঁচজনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আজ আদালতে তোলা হবে।




