কাঠগড়ায় মিয়ানমার

Social Share

রোহিঙ্গা জেনোসাইডের দায়ে অবশেষে বিচারের মুখোমুখি মিয়ানমার। আজ ১০ ডিসেম্বর মঙ্গলবার বিশ্ব মানবাধিকার দিবসে নেদারল্যান্ডসের হেগের পিস প্যালেসে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে (ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস, সংক্ষেপে আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার মামলার শুনানি শুরু হবে। আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত গাম্বিয়া ও মিয়ানমার যুক্তিতর্ক তুলে ধরবে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার আবেদনের ওপর।

২০১৭ সালের আগস্ট মাসের রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ ও জেনোসাইডের আড়াই বছরের মধ্যেই মিয়ানমার বিচারের মুখোমুখি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অপরাধের ক্ষেত্রে এত স্বল্প সময়ে বিচারের উদ্যোগ নজিরবিহীন। মামলায় মিয়ানমারের পক্ষে নেতৃত্ব দিতে আইনজীবীদল নিয়ে গত রবিবার হেগে গেছেন মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী অং সান সু চি। অন্যদিকে গাম্বিয়ার পক্ষে দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল ও বিচারমন্ত্রী আবুবকর এম তামবাদুউর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল হেগে পৌঁছেছে।

শুনানি পর্যবেক্ষণ করতে পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (এশিয়া-প্যাসিফিক) মাসুদ বিন মোমেনসহ বাংলাদেশের উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল হেগে উপস্থিত থাকবে। শুনানি ঘিরে হেগে গেছেন কানাডার মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত বব রেসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা।

জানা গেছে, কক্সবাজারে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের একটি প্রতিনিধিদলও হেগে পৌঁছেছে। এ ছাড়া সেখানে যাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আশ্রিত রোহিঙ্গারা। যুক্তরাজ্যভিত্তিক রোহিঙ্গাদের সংগঠন বার্মিজ রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশন ইউকের প্রেসিডেন্ট তুন খিন বলেন, ‘অবশেষে মিয়ানমার সরকার ও এর সামরিক বাহিনী এখন সত্যিকারের চাপ অনুভব করছে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের ওপর জেনোসাইড সংঘটিত হচ্ছে—এ বিষয়ে আমরা আইসিজের আইনি রুলিং দেখতে চাই। যদি সেটি না-ও হয় আমাদের প্রত্যাশা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আমাদের রক্ষার মতো দৃষ্টি দেবে।’

তুন খিন বলেন, মিয়ানমার সরকার ও সামরিক বাহিনীকে বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থন করাতে বাধ্য করা হচ্ছে। এখন

তারা অপরাধের জবাবদিহিতে ভয় পাবে।’

শুনানি চলাকালে হেগে আদালতের সামনে মিয়ানমারের পক্ষে-বিপক্ষে মিছিলের ডাক দিয়েছে রোহিঙ্গাবিরোধী ও সমর্থকরা। আগামীকাল বুধবার বড় ধরনের জমায়েত হওয়ার কথা। তবে মিয়ানমারের শান রাজ্যের ১৭টি সংগঠন মিয়ানমারের জবাবদিহির পক্ষে বিবৃতি দিয়েছে।

মামলায় যা হতে পারে : আইসিজে ব্যক্তির অপরাধের বিচার করে না। সাধারণত সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বিরোধ নিষ্পত্তিতে ভূমিকা রাখে। আইসিজেতে গাম্বিয়ার মামলা নজিরবিহীন। কারণ এর আগে জেনোসাইডের মামলা নিয়ে কেউ আইসিজেতে যায়নি। তবে অত্যন্ত ইতিবাচক দিক হলো আইসিজের মামলাটি শুনানির জন্য গ্রহণ।

বর্তমান বিশ্বে জেনোসাইড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য হেগে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত (আইসিসি) আছে। মিয়ানমার ওই আদালতের সদস্য নয়। বাংলাদেশ আইসিসির সদস্য হওয়ায় এবং রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার থেকে অপরাধের শিকার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের মধ্য দিয়ে যে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, সেসব অপরাধের তদন্ত ও বিচারের এখতিয়ার আইসিসির আছে। মিয়ানমার তা প্রত্যাখ্যান করলেও আইসিসি ওই অপরাধগুলো তদন্তের অনুমতি দিয়েছে।

আইসিসি ব্যক্তিবিশেষের অপরাধের বিচার করে। অন্যদিকে আইসিজে রাষ্ট্রের বিচার করে। গাম্বিয়ার আবেদন বিবেচনায় নিয়ে আইসিজে যদি কোনো অন্তর্বর্তী আদেশও দেয় তবে তা এই সংকটের ক্ষেত্রে বড় মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে যে আদেশই আসুক না কেন তা হবে মামলার দুই পক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সবার জন্য বাধ্যতামূলক।

আইসিসি, আইসিজে—কারোরই নিজস্ব কারাগার বা আদেশ বাস্তবায়ন করার মতো নিরাপত্তা বাহিনী নেই। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতার ওপরই তাদের আদেশ বাস্তবায়ন নির্ভর করে। কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, রোহিঙ্গা ইস্যুতে আইসিসি বা আইসিজে যদি কোনো আদেশ দেয় তবে সেটি বাস্তবায়নে অনেক দেশই ইতিবাচক মনোভাব দেখাতে পারে।

মামলায় যা আছে : গাম্বিয়া গত ১১ নভেম্বর আইসিজেতে দায়ের করা মামলায় অভিযোগ করেছে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর জেনোসাইড চালিয়ে মিয়ানমার ‘দ্য কনভেনশন অন দ্য প্রিভেনশন অ্যান্ড পানিশমেন্ট অব দ্য ক্রাইম অব জেনোসাইড’ (জেনোসাইড সনদ) লঙ্ঘন করেছে। গাম্বিয়া সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ করেছে, ২০১৬ সালের অক্টোবর মাস থেকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী (তাতমাদাও নামে পরিচিত) রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ও ব্যাপক মাত্রায় অভিযান শুরু করে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী নিজেই ওই অভিযানের নাম দিয়েছে ‘নির্মূল অভিযান।’ রোহিঙ্গাদের গোষ্ঠীগতভাবে ধ্বংস করতে ওই অভিযানে ‘মাস মার্ডার’ (ব্যাপক হত্যা), ধর্ষণ ও অন্যান্য যৌন নিপীড়নের পাশাপাশি তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের ঘরে আটকে রেখে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে নতুন করে শুরু হওয়া নির্মূল অভিযান ছিল আরো ব্যাপক মাত্রার এবং বিস্তৃত এলাকা নিয়ে।

মামলায় গাম্বিয়া দাবি করেছে, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের সঙ্গে যেসব অপরাধ করেছে সেগুলো জেনোসাইড সনদের লঙ্ঘন। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে গাম্বিয়া মিয়ানমারের কাছে এই দাবি তুলে আসছে। কিন্তু মিয়ানমার বরাবরই অপরাধ অস্বীকার করছে।

গাম্বিয়া ও মিয়ানমার উভয়ই জেনোসাইড সনদ সই ও অনুমোদনকারী দেশ। আইসিজের কাছে বিষয়টি তুলে ধরে গাম্বিয়া আবেদনে বলেছে, মিয়ানমারের জেনোসাইড সনদের অনুচ্ছেদ ১, ৩(ক), ৩(খ), ৩(গ), ৩(ঘ), ৩(ঙ), অনুচ্ছেদ ৪, ৫ ও ৬ লঙ্ঘন করেছে বলে আইসিজে যেন রায় দেয়।

শুনানি সূচি : কাকতালীয়ভাবে আজ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসেই শুরু হচ্ছে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়নমারের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের মামলার শুনানি। আইসিজের ঘোষিত কার্যসূচি অনুযায়ী, আজ বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত গাম্বিয়া এবং আগামীকাল বুধবার একই সময়ে মিয়ানমার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করার সুযোগ পাবে। আগামী বৃহস্পতিবার গাম্বিয়া বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে ৪টা এবং মিয়ানমার রাত সাড়ে ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সুযোগ পাবে। ওই তিন দিনের শুনানি হবে আদালতের অন্তর্বর্তী আদেশের আবেদন নিয়ে।

জানা গেছে, মামলা চলতে পারে বছরের পর বছর। মামলা নিষ্পত্তি ও পূর্ণ রায়ের আগে জরুরি ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী আদেশ চেয়ে আবেদনে গাম্বিয়া বলেছে, আইসিজে যেন জেনোসাইড সনদের আওতায় রোহিঙ্গাদের ওপর জেনোসাইড চালানো বন্ধ করতে এবং জেনোসাইড থেকে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় সব ধরনের উদ্যোগ নিতে মিয়ানমারকে নির্দেশনা দেয়। এ ছাড়া মিয়ানমার যাতে জেনোসাইডের অভিযোগ সম্পর্কিত কোনো আলামত নষ্ট না করে সে বিষয়েও আদালতের অন্তর্বর্তী নির্দেশনা চেয়েছে গাম্বিয়া।

সু চির সম্ভাব্য ভূমিকা : বৈশ্বিক অঙ্গনে সন্দেহ ও শঙ্কার মধ্যেই আইসিজেতে গাম্বিয়ার মামলা মোকাবেলার সিদ্ধান্তের কথা জানায় মিয়ানমার। সু চি নিজেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে মিয়ানমারের পক্ষে মামলায় ‘এজেন্ট’ হওয়ার ঘোষণা দেন। জানা গেছে, এজেন্ট হিসেবে মামলার শুনানিতে সু চির ভূমিকা থাকবে নির্দিষ্ট। আদালতে মিয়ানমার সরকারের পক্ষে আনুষ্ঠানিক যেসব ভূমিকা রাখার সুযোগ থাকবে তা তিনি রাখতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে প্রারম্ভিক বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারেন। তবে মামলার আইনি মারপ্যাঁচ ও অভিযোগ খণ্ডানোর কাজ তাঁর পক্ষের আইনজীবীদেরই করতে হবে।

গাম্বিয়া যে কারণে : বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ রোহিঙ্গা জেনোসাইড নিয়ে উদ্বেগ জানালেও মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় জবাবদিহির আওতায় এনেছে পশ্চিম আফ্রিকার ছোট্ট মুসলিম রাষ্ট্র গাম্বিয়া। এর নেপথ্যে আছে অনেক দেশ। বাংলাদেশেরও জোরালো সমর্থন, সহযোগিতা আছে। মূলত ৫৭টি মুসলিম রাষ্ট্রের জোট ওআইসির পক্ষে আইসিজেতে মামলা করেছে গাম্বিয়া। ওআইসিতে ওই মামলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। মিয়ানমার প্রতিবেশী হওয়ায় আলোচনার দরজা খোলা রাখার স্বার্থে এবং কৌশলগত কারণে বাংলাদেশ ওই মামলা করেনি বলে জানা গেছে।