কাউন্সিলর মনজুর চাঁদার খনি রাজধানী মার্কেট

ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ময়নুল হক মনজু রাজধানী সুপার মার্কেটকে বানিয়েছিলেন তাঁর টাকার খনি। কোনো ব্যবসায়ী যদি দোকানে আইটেম পরিবর্তন করতেন, তাহলে মনজুকে দিতে হতো দুই লাখ টাকা চাঁদা। আর জেনারেটর বাণিজ্য করতে লোডশেডিং না হলেও মার্কেটের বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিতেন। খেয়াল-খুশিমতো ওই মার্কেটে দোকান নির্মাণের পর মালিকানা দাবি করে বিক্রি করে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। দম্ভ করে মনজু বলতেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁর কিছুই করতে পারবে না।

রাজধানীর হাটখোলা রোডের ১৫/২ নম্বর বাড়িটিও দখল করে নিজের বলে দাবি করেন মনজু। একটি ফ্ল্যাট কিনে পরে ওই বাড়ির মালিককে ভয়ভীতি দেখিয়ে উচ্ছেদ করে নিজের নামে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে মালিক বনে যান। তাঁর ও তাঁর বাহিনীর ভয়ে তটস্থ ছিল এলাকাবাসী। একইভাবে রাজধানী মার্কেটেও দুটি দোকান লিজ নিয়ে একপর্যায়ে পুরো মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ নেন মনজু। রাজধানী মার্কেটের ব্যবসায়ী, স্থানীয় লোকজন এবং র‌্যাব-পুলিশের সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

গতকাল শুক্রবার রাজধানী মার্কেটে গিয়ে দেখা গেছে, আগের দিন কাউন্সিলর মনজু র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ায় আনন্দ প্রকাশ করছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁরা একে অন্যকে মিষ্টিমুখ করাচ্ছেন। গত ১১ বছর মনজু ও তাঁর বাহিনীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ ছিলেন ব্যবসায়ীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয় কাউন্সিলর ও সরকারি দলের রাজনীতি করায় নিজেকে ওই এলাকার রাজা ভাবতেন মনজু। তাঁর বিরুদ্ধে র‌্যাব-পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করলেও পাত্তা দিতেন না মনজু। তিনি বলে বেড়াতেন, ‘আমি এই এলাকার ডিসি, ম্যাজিস্ট্রেট সব। আমার বিষয়ে কিছু জানতে হলে আমার কাছে আসতে হয়। আমি কারো কাছে যাই না।’

১১ বছর আগে দুটি দোকান লিজ নিয়ে রাজধানী মার্কেটে প্রবেশ করেন মনজু। এরপর পুরো মার্কেটে তাঁর আধিপত্য বিস্তার করতে ক্যাডার ধরনের কয়েকজন ব্যবসায়ীকে জোগাড় করেন। ওই সময় মার্কেটে ব্যবসায়ীদের নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন লুত্ফর রহমান নামের একজন ব্যবসায়ী। সেক্রেটারি ছিলেন ব্যবসায়ী আফজাল হোসেন ঢালী। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু করেন মনজু। ২০০৯ সালে একদিন রাতে মনজু তাঁর ক্যাডার বাহিনী নিয়ে ব্যবসায়ী সমিতির অফিস থেকে নির্বাচিত সভাপতি ও সেক্রেটারিকে জোর করে বের করে তালা ঝুলিয়ে দেন। মনজু তখন ওই এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলর। তিনি জানিয়ে দেন, তাঁর কথা ছাড়া আর রাজধানী মার্কেট চলবে না। পরদিন থেকে তিনি নিজেকে মার্কেটের স্বঘোষিত সভাপতি দাবি করেন। সেই থেকে বর্তমান পর্যন্ত মনজুই রাজধানী মার্কেটের সভাপতি। আর এই সময়ের মধ্যে ওই মার্কেটে চালিয়েছেন যথেচ্ছ চাঁদাবাজি।

ব্যবসায়ীরা জানান, সরকার ঘোষিত বিদ্যুৎ বিল প্রতি ইউনিট ১০ টাকা। কিন্তু প্রত্যেক ব্যবসায়ীকে দিতে হয় ১৩ টাকা ৫০ পয়সা। প্রতি মাসে ৮-১০ লাখ টাকা শুধু বিদ্যুৎ থেকেই চাঁদাবাজি করতেন মনজু।

২০ বছর আগে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের সাড়ে চার বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলা হয় রাজধানী সুপার মার্কেট। ১৪ জন ব্যবসায়ী মার্কেটটি লিজ নিয়েছিলেন। তাঁদের অধিকাংশ এরই মধ্যে মারা গেছেন। তাঁদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা রাজধানী সুপার মার্কেটে ওই সময় যাঁরা দোকান বরাদ্দ নিয়েছিলেন, প্রতি দোকানের জন্য দিতে হয়েছিল ২৫ হাজার টাকা। এরপর প্রতি দোকান থেকে মাসে ভাড়া নেওয়া হতো ২৮০ টাকা। যা পর্যায়ক্রমে বর্তমানে উঠেছে এক হাজার টাকায়। জমি মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের হলেও নিয়ন্ত্রণ নেই। নিয়ন্ত্রণ মনজুর হাতে।

এক ব্যবসায়ী জানান, কিছুদিন আগে মার্কেটের গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গায় কয়েকটি দোকান নির্মাণ করে প্রতিটি ২৩ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন মনজু। এসব দোকান বিক্রি করেই মনজু হাতিয়ে নিয়েছেন কয়েক কোটি টাকা।

আরেক ব্যবসায়ী জানান, মার্কেটের জন্য তিনটি জেনারেটর রয়েছে। সেই জেনারেটর থেকেও ফায়দা লুটেছেন মনজু। বিদ্যুৎ না গেলেও মনজুর নির্দেশে বিদ্যুৎ বন্ধ করে জেনারেটর চালিয়ে মাসে পাঁচ-ছয় লাখ টাকা নিতেন তিনি। আর প্রত্যেক দোকানকে মাসোয়ারা দিতে হতো মনজুকে। কেউ প্রতিবাদ করলে তাঁর দোকানের বিদ্যুতের লাইন কেটে দিতেন মনজুর ক্যাডাররা। তাঁর ক্যাডারদের মধ্যে রয়েছেন—সায়েম, সাইদুলসহ আরো কয়েকজন। মনজুর নির্দেশে মার্কেটের চারপাশের ফুটপাতে দোকান বসানো হয়েছে। প্রতিটি দোকান থেকে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। ক্যাডার সাইদুল চাঁদার ওই টাকা মনজুর হাতে তুলে দেন। মার্কেটের চারপাশের ফুটপাতে শতাধিক দোকান থেকে প্রতিদিন চাঁদা তোলা হয় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। মনজুর ক্যাডার বাহিনীর সাইদুল, বোমা সায়েমী, আওলাদ, জাফর সানি, আবদুল হকদের হাতে রাজধানী সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ীরা ৯ বছর ধরে জিম্মি বলে জানিয়েছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা।

কোনো দোকানে কাপড়ের পরিবর্তে যদি বেডশিট ওঠাতে চাইতেন কোনো ব্যবসায়ী, এই আইটেম পরিবর্তনের জন্য মনজুকে দিতে হতো দুই লাখ টাকা চাঁদা। না দিলে দোকান বন্ধ। কয়েক মাস আগে একটি ফাস্ট ফুডের দোকান থেকে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন মনজু। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় ওই দোকানটিই বন্ধ করে দেয় মনজুর ক্যাডার বাহিনী। পরে এক লাখ ২০ হাজার টাকা চাঁদা দিয়ে রক্ষা পান ফাস্ট ফুড ব্যবসায়ী।

রাজধানী সুপার মার্কেটের দোকানি আশরাফ উদ্দিন টিটু বলেন, ‘মনজু হলেন রাজধানী সুপার মার্কেটের অঘোষিত রাজা। তাঁর বিরুদ্ধে কেউ কোনো কথা বলতে পারেন না। কেউ চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করলে তাঁর বিরুদ্ধে ভুয়া মামলা দেন মনজু। দোকানের বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিয়ে হয়রানি করেন।’

জানা গেছে, অবৈধভাবে মনজু ১১০টি দোকান বিক্রি করেন। প্রতিটির দাম ১০ লাখ টাকা। এ বাবদ তিনি হাতিয়ে নিয়েছেন ১০ কোটি টাকার বেশি।

কয়েক বছর আগে হাটখোলা রোডের ১৫/২ নম্বর চারতলা গ্লোব ভবনের বাড়ির চতুর্থ তলায় একটি ফ্ল্যাট কেনেন মনজু। বাড়ির মালিক থাকতেন দ্বিতীয় তলায়। পরে তাঁকে ভয়ভীতি দেখিয়ে উচ্ছেদ করেন। এরপর মনজু কিছু ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে পুরো বাড়ির মালিক হিসেবে নিজেকে ঘোষণা করেন। র‌্যাবের অভিযানে মনজু গ্রেপ্তারের পর ওই বাড়ির প্রকৃত মালিক র‌্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন বলে জানা গেছে। মনজুকে সঙ্গে নিয়ে ওই বাড়িতেই অভিযান চালায় র‌্যাব।

জানতে চাইলে র‌্যাব-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাফিউল্লাহ বুলবুল গতকাল সন্ধ্যায় বলেন, ‘তাঁকে গ্রেপ্তারের পর অনেকে অভিযোগ নিয়ে আসছেন। আগে তাঁরা অভিযোগ করতে ভয় পেতেন। তাঁর বিরুদ্ধে ওয়ারী থানায় দুটি মামলা হয়েছে। মামলা দুটি তদন্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হবে। যদি মামলা আমরা পাই, তাহলে তাঁর অপরাধ জগৎ ও সহযোগীদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।’

ওয়ারী থানায় দায়ের করা মামলার তদন্তভার পেয়েছেন ওয়ারী থানার সাব-ইন্সপেক্টর হারুনুর রশীদ। তিনি গতকাল সন্ধ্যায় বলেন, ‘আমরা তাঁকে রিমান্ডে পেয়েছি। এখন জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’ আর তিনি বাড়ি দখল করেছেন এমন খবর শোনা যাচ্ছে। তবে এখনো এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তা ছাড়া আমরা অস্ত্র ও মাদক আইনের মামলা তদন্ত করছি। ফলে বাড়ির বিষয়টি আমরা দেখছি না।’

১০ দিনের রিমান্ড : অস্ত্র ও মাদক আইনে করা দুই মামলায় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ময়নুল হক মনজুর ১০ দিনের রিমান্ড মনজুর করেছেন আদালত। গতকাল তাঁকে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে পুলিশ। ওয়ারী থানায় অস্ত্র ও মাদক আইনে করা দুই মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য সাত দিন করে ১৪ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম ধীমান চন্দ্র মণ্ডল অস্ত্র মামলায় পাঁচ দিন এবং মাদক মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ড মনজুর করেন।