করোনা ভাইরাস ভ্যাকসিন: গ্লোব বায়োটেকের বঙ্গভ্যাক্স টিকার ট্রায়াল শুরু হচ্ছে ঢাকার হাসপাতালে

37
Social Share

স্টার্ফ রিপোর্টার: বাংলাদেশের একটি প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেক তাদের উৎপাদিত করোনাভাইরাস টিকা মানবদেহে পরীক্ষা চালানোর অনুমতির জন্য আবেদন করেছে। রবিবার বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদের কাছে এই আবেদন করা হয়।

বলা হচ্ছে অনুমোদন পাওয়ার পরের সাত থেকে দশদিনের মধ্যে ঢাকার কোন একটি বেসরকারি হাসপাতালে শখানেক স্বেচ্ছাসেবকের উপর টিকাটি প্রয়োগ করা হবে ট্রায়ালের জন্য। গ্লোব বায়োটেকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাকন নাগ বলেন, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরুর আবেদনটি তাদের পক্ষ থেকে করেছে ক্লিনিক্যাল রিসার্চ অর্গানাইজেশন লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের ওষুধ প্রশাসনের অনুমোদিত একটি প্রতিষ্ঠান।

ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটি। যার স্পন্সর করছে গ্লোব বায়োটেক। “ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করতে হলে সাধারণত তৃতীয় একটি পক্ষের মাধ্যমে করতে হয়, সেই তৃতীয় পক্ষ হিসেবেই এই প্রতিষ্ঠানটি কাজ করছে,” বলেন মি. নাগ। পুরো ট্রায়ালটি পরিচালনা করবে একটি গবেষক দল। যারা আজকের আবেদনটি জমা দিয়েছে।

কীভাবে করা হবে?

মানবদেহে গ্লোব বায়োটেকের টিকার ট্রায়ালটি কিভাবে করা হবে সেটি আবেদনপত্রে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এটি অনুমোদনের আগ পর্যন্ত এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলা যাবে না বলে জানান মি. নাগ।

তিনি বলেন, ট্রায়ালটি কোথায় করা হবে সেটিও এথিক্যাল কমিটির অনুমোদনের পরই নির্ধারিত হবে। তবে আপাতত বলা যায় যে, এটি ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ট্রায়াল পরিচালনা করা হবে। এই ট্রায়ালে শতাধিক স্বেচ্ছাসেবী অংশ নেবেন বলেও জানানো হয়।

তিনি বলেন, “কোথায় ট্রায়ালটি হবে সেটি এখন বললেও পরে এটি পরিবর্তিত হতে পারে। তবে এটা নিশ্চিত যে একটি বেসরকারি হাসপাতালেই করা হবে।”

বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদের অনুমোদনের পর ৭-১০ দিনের মধ্যেই টিকার ট্রায়াল শুরু হবে বলেও জানান মি. নাগ।

ট্রায়ালটি কতদিন চলবে?

কাকন নাগ বলেন, ফেস ওয়ান এবং ফেস টু- এই দুটি ধাপের জন্য ট্রায়ালের অনুমোদনের আবেদন করা হয়েছে। একটি ফেস বা ধাপ শেষ হলে আরেকটি শুরু হবে। এই একটি ধাপ শেষ করতে হলে ৪০-৪৫ দিন লাগতে পারে বলে জানান তিনি। প্রথম ধাপটি শেষ হওয়ার পর ফেস টু বা দ্বিতীয় ধাপটি শুরু হবে। তবে এর মধ্যে তথ্য মূল্যায়নের বিষয়টি রয়েছে বলেও জানান।

গ্লোব বায়োটক বলছে, এই ভ্যাকসিনটির একটি ক্যান্ডিডেটের প্রি-ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
গ্লোব বায়োটক বলছে, এই ভ্যাকসিনটির একটি ক্যান্ডিডেটের প্রি-ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

টিকা আসতে কতদিন সময় লাগবে?

গত অক্টোবরে বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মি. নাগ বলেছিলেন যে, ৬ মাসের মধ্যে টিকা ব্যবহারের জন্য উৎপাদন করা সম্ভব হবে।সে অনুযায়ী এরইমধ্যে প্রায় তিন মাস পেরিয়ে চার মাস হতে চললো। তবে এখনো টিকা উৎপাদন নয় বরং ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য আবেদন করা হয়েছে।

ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালেরও তিন থেকে চারটি ধাপ রয়েছে। যার মধ্যে মাত্র দুটি ধাপের অনুমোদনের জন্য রবিবার আবেদন করা হয়েছে। এই পর্যায়ে এসে টিকা বাজারে আসতে আর কতদিন লাগবে এমন প্রশ্নের উত্তরে মি. নাগ বলেন, এখনো টিকা উৎপাদন বিষয়ক ৫-৬ মাসের কাজই বাকি রয়েছে।

তিনি বলেন, “এর যে ব্যবস্থাপনাগুলি, এর অনুমোদনগুলি মাত্রাতিরিক্ত সময় লেগে যাচ্ছে বাংলাদেশে। কিন্তু কেন সে বিষয়টি আমি জানি না।”

তিনি কিওরভ্যাক নামে জার্মানির একটি ভ্যাকসিনের উদাহরণ টেনে বলেন, এই ভ্যাকসিনটি বঙ্গভ্যাক্সের দুই সপ্তাহ পরে আবিষ্কার হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। সেদেশের সরকারের সহযোগিতায় ভ্যাকসিনটি এরইমধ্যে হিউম্যান ট্রায়ালের তৃতীয় ধাপে রয়েছে। কিন্তু বঙ্গভ্যাক্স এখনো হিউম্যান ট্রায়ালের মাত্র প্রথম ধাপ শুরু করার আবেদন করেছে।

তিনি বলেন, অনুমোদনের যে দীর্ঘসূত্রিতা, সেটাই জড়িত। ওখানে এটা প্রায়োরিটির ভিত্তিতে অনুমোদন দেয়া হয়েছে বলে ওরা তৃতীয় ধাপে আছে এবং আগামী মাসে হয়তো বাজারে আনারও অনুমোদন পেয়ে যাবে।

“অনুমোদনের যে ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিটা এখানে আছে সেটার দীর্ঘসূত্রিতাই এটার জন্য দায়ী। এটা আর কতদিন ডিলে হবে সেটাও আমি বলতে পারছি না,” বলেন তিনি। তবে এবিষয়ে বাংলাদেশ ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাহবুবুর রহমান বলেন, কোন ধরণের দীর্ঘসূত্রিতা হয়নি এবং অনুমোদনের আবেদন পাওয়ার পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে অনুমোদন দিয়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়া ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষে তাদের কাছে টিকা উৎপাদনের আবেদন আসলে সেটিও দ্রুততম সময়ের মধ্যে অনুমোদন দেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

অনুমোদনের পরবর্তী ধাপ কী?

বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদের একটি কমিটি রয়েছে যারা গ্লোব বায়োটেকের যে আবেদনপত্র আছে সেগুলি মূল্যায়ন করে দেখে তার পর অনুমোদন দেবেন।

গবেষকরা বলছেন, ভ্যাকসিনটি দেহে অ্যান্টিবডি তৈরি করবে।
গবেষকরা বলছেন, ভ্যাকসিনটি দেহে অ্যান্টিবডি তৈরি করবে।

মি. নাগ বলেন, এথিক্যাল কমিটির মূল দায়িত্ব হচ্ছে, এই ওষুধটি যে স্বেচ্ছাসেবীদের উপর প্রয়োগ করা হবে তাদের যদি কোন ধরণের হুমকি তৈরি না হয় অর্থাৎ কোন রিস্ক না থাকে এবং যদি কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয় তাহলে সেগুলো কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে, সেই নিয়ম-কানুন সঠিকভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কিনা তা যাচাই করা। “অনাকাঙ্ক্ষিত কোন ঘটনা ঘটলে সেটা সামাল দেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে কিনা সেটি দেখাই এই কমিটির কাজ।”

এরইমধ্যে ট্রায়ালের জন্য যে টিকা মানবদেহে প্রয়োগ করা হবে, সেই টিকা উৎপাদন করার অনুমোদন এরইমধ্যে বাংলাদেশ ওষুধ প্রশাসন দিয়েছে। ট্রায়ালের পর এটি আবারো ওষুধ প্রশাসনের কাছে আবেদন করা হবে টিকা বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য।

বিএমআরসি কী বলছে?

বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মোঃ হাবিবে মিল্লাত বলেন, অনুমোদনের প্রক্রিয়াটি হচ্ছে, কোন আবেদন আসলে সেটি রিভিউ করতে বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠানো হয়। এগুলো যেহেতু জরুরি তাই বিশেষজ্ঞদের রিভিউ দ্রুত দিতে বলা হয়। তাদের যদি কোন বিষয়ে কোন তদন্ত করার থাকে তাহলে তারা সেটি ইনভেস্টিগেটর বা ট্রায়াল পরিচালনাকারী দলের তদন্ত কর্মকর্তার কাছে পাঠাবে। তারা যত দ্রুত উত্তর দেবে তত দ্রুত এর রিভিউ সম্পন্ন করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা যদি কোন সমস্যা না দেখেন তাহলে তারা একটি প্রতিবেদন দেন যা বিএমআরসির এথিক্যাল কমিটির কাছে পাঠানো হয়। এই কমিটি ক্লিয়ারেন্স দিলে সেটি জানিয়ে দেয়া হয় এবং এর পর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালাতে পারবে। তবে এর পর বাংলাদেশ ওষুধ প্রশাসনেরও একটি অনুমোদন লাগে।

তবে সব কিছু ঠিক থাকলে বিএমআরসির অনুমোদন পেতে সপ্তাহ দুয়েকের মতো সময় লাগে বলে জানান মি. মিল্লাত।