করোনা দুর্যোগ মোকাবিলায় বাজেট বাস্তবায়ন ভাবনা

Social Share

ড. প্রিয় ব্রত পাল : ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। দেশের ৪৯তম ও আওয়ামী লীগের ২১তম এই বাজেটে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর করোনা ভাইরাস মহামারীর আঘাত কাটিয়ে ওঠার প্রস্তাবনা পেশ করেছেন। করোনা ভাইরাসের কারণে সংকটময় পরিস্থিতি এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে মানুষের জীবন-জীবিকার কথা বিবেচনায় রেখে এবারের বাজেটের শিরোনাম হয়েছে ‘অর্থনৈতিক উত্তরণ : ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা’। এবারের বাজেট ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার। সীমিত অর্থনৈতিক কর্মকা- ও খরচ বৃদ্ধির চাপের মধ্যেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা।

প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য, কৃষি, সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বাজেট প্রস্তাব উত্থাপন করে অর্থমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, স্বাস্থ্য খাতের পরপরই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে কৃষি খাতকে। করোনা ভাইরাস মহামারী সময়ে দীর্ঘ সাধারণ ছুটি ও লকডাউনের কারণে খেটে খাওয়া গরিব মানুষের কষ্ট লাঘব করতে সামাজিক নিরাপত্তাকে তৃতীয় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এর পরই অর্থ মন্ত্রণালয় অগ্রাধিকার দিয়েছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও গ্রামীণ উন্নয়নের ওপর। সব মিলিয়ে স্বাস্থ্য খাতে মোট ৪১ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী যা জিডিপির ১.৩ শতাংশ এবং মোট বাজেটের ৭.২ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতের অভিজ্ঞ গবেষক, পুষ্টিবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, পরিবেশবিদ ও সুশীল সমাজ এবং অন্যান্য প্রতিনিধির সমন্বয়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করে এ গবেষণা তহবিল পরিচালনা করা হবে। রেমিট্যান্স দুই দশমিক প্রণোদনা অব্যাহত থাকবে। বাজেটের ১৭ শতাংশ সামাজিক নিরাপত্তায় প্রতিরক্ষা বরাদ্দ বাড়ল ২৩২২ কোটি টাকা। করোনা ভাইরাস মহামারীর জন্য নতুন অর্থবছরের বাজেট স্বাস্থ্য সামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক কমানোর পাশাপাশি রাজস্ব আয় বাড়াতে বিলাস দ্রব্যসহ বেশ কিছু পণ্যের শুল্ক ও কর ভার বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

বাজেটের অর্থায়নের ৫৮ দশমিক ১ শতাংশ আসবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নিয়ন্ত্রণ কর থেকে, ১৯.৫ শতাংশ আসবে অভ্যন্তরীণ ঋণ থেকে, বৈদেশিক ঋণ থেকে আসবে ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং বৈদেশিক অনুদান থেকে আসবে মাত্র ০.৭ শতাংশ।

জাতীয় রাজস্বের ৮০ শতাংশের অধিক সংগ্রহ করা হচ্ছে পরোক্ষ কর থেকে যা সর্বসাধারণ অর্থাৎ গরিবদের ওপর চাপ বাড়বে তাই নতুন প্রত্যক্ষ করদাতার সংখ্যা বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে সীমাহীন ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ করে প্রায় তিন-চারগুণ আয় বৃদ্ধি করা সম্ভব।

যেহেতু অভ্যন্তরীণ উৎসের অধিকাংশ ব্যাংক থেকে সংগ্রহ করা হয় যা ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের জন্য লোন পেতে দারুণ সমস্যায় পড়তে হয় তাই বৈদেশিক অনুদান ও করোনা ভাইরাস মোকাবিলার জন্য সহজ শর্তে ঋণ সংগ্রহের জোর প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ বাবদ ব্যয় হবে ৪.৭ শতাংশ, কৃষি বাবদ ৩.৬ শতাংশ, শিল্প ও অর্থনৈতিক সার্ভিস বাবদ মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ অথচ পরিবহন যোগাযোগ বাবদ ১১ দশমিক ২ শতাংশ, সুদ বাবদ ১১ দশমিক ২ শতাংশ ও শিক্ষায় প্রযুক্তি বাবদ ১৫ দশমিক ১ শতাংশ।

যোগাযোগ, শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে বিশেষ করে রাস্তাঘাট তৈরি ও মেরামত এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও প্রযুক্তি খাতে দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। তা হলে আমাদের সুদ বাবদ খরচ অনেকাংশে কমে যাবে।

করোনা দুর্যোগের এবং ঘূর্ণিঝড় আম্পানের কারণে অনেকে কর্মহীন হয়ে পড়েছে। অধিকন্তু বিদেশ থেকেও কর্মহীন অবস্থায় অনেকে দেশে ফেরত আসতে বাধ্য হচ্ছেন। তাদের জন্য কর্মসংস্থানের কৌশল তৈরি করতে হবে।

চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে যেখানে ৫.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে সেখানে আগামী বছরে প্রবৃদ্ধি ৮.২ হবে একেবারে অবাস্তব কাল্পনিক। করোনা ভাইরাস সংকটের মধ্যে অর্থনীতির মূল স্রোতে অর্থ প্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে আয়কর অধ্যাদেশে দুটি ধারা সংযোজনের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী, যাতে ঢালাওভাবে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকে। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জাতীয় সংসদে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন সেখানেই এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেন, দেশের প্রচলিত আইনে যাই থাকুক না কেন, আগামী ১ জুলাই ২০২০ থেকে ৩০ জুন ২০২১ সাল পর্যন্ত ব্যক্তি শ্রেণির করদাতারা আয়কর রিটার্নে অঘোষিত জমি, বিল্ডিং, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্টের ওপর প্রতি বর্গমিটারের ওপর নির্দিষ্ট হারে এবং সঞ্চয়পত্র, শেয়ার বন্ড বা অন্য কোনো সিকিউরিটির ওপর ১০ শতাংশ কর দিয়ে আয়কর রিটার্নে প্রদর্শন করলে আয়কর কর্তৃপক্ষ বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করতে পারবে না।

এর পাশাপাশি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক কর্মকা-ের অন্যতম চালিকাশক্তি পুঁজিবাজারকে গতিশীল করতে তিন বছরের লক ইনসহ কতিপয় শর্তে আগামী পহেলা জুন ২০২০ থেকে ৩০-০৬-২০১৯ পর্যন্ত ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের অর্থ বিনিয়োগ করলে এবং ওই বিনিয়োগের ওপর ১০ শতাংশ কর দিলে আয়কর কর্তৃপক্ষ বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করতে পারবে না।

অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, করোনা ভাইরাস মহামারীর কারণে সবচেয়ে বেশি দরিদ্রপ্রবণ ১০২ উপজেলায় সব দরিদ্র প্রবীণ ব্যক্তিকে বয়স্কভাতার আওতায় আনা হবে, তাতে ৫ লাখ নতুন উপকারভোগী যোগ হবে।

এই উপজেলাগুলোর সব বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত নারীকে ভাতার আওতায় আনা হবে, এতে নতুন যোগ হবে সাড়ে তিন লাখ উপকারভোগী।

এ ছাড়া নতুন করে ২,৫৫,০০০ নতুনসহ মোট ১৮ লাখ অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা দেওয়া হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

সেই সঙ্গে মহামারীর আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল করা এবং গ্রামের দুস্থ ও অসহায় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরে পল্লী সমাজসেবা কার্যক্রমের জন্য ১০০ কোটি টাকা প্রণোদনা ঘোষণা করেন তিনি।

আসছে অর্থবছরে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে সরকারের টাকার অঙ্কে বরাদ্দ কিছুটা বাড়লেও জিডিপির অনুপাতে তার ০.০৫ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে।

আসছে অর্থবছরে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ জিডিপির ২.৭০ শতাংশের সমান বিদায়ী অর্থবছরে ছিল ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ অথচ আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী একটি দেশের শিক্ষায় ৬ শতাংশ বরাদ্দ ধরা হয়।

করোনা ভাইরাস মহামারীর মধ্যে যখন মানুষ যোগাযোগের ক্ষেত্রে মোবাইলনির্ভর হয়ে পড়েছে সেই সময় মোবাইল সেবার ওপর সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধির প্রস্তাব হতাশাজনক হবে। কারণ দরিদ্র মানুষের জন্য অসহনীয় হয়ে পড়বে এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের পথে অন্তরায় হয়ে উঠবে যা করোনা ভাইরাস সংকটের কারণে আরও বাড়বে।

বর্তমানে করোনাকালে স্বাস্থ্য খাতে যে অপচয় ও দক্ষতার অভাব, সমন্বয়হীনতা ও অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে তা গুরুত্বসহকারে তদন্ত করতে হবে। কোটি কোটি টাকার যন্ত্রাংশের অপচয়, সমন্বয়হীনতা দূর করতে হবে। আমাদের স্বাস্থ্য খাতকে দীর্ঘদিনের অবহেলা থেকে মুক্ত করে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করতে হবে কমিউনিটি ক্লিনিককে ইউনিট ধরে। বরাদ্দের চাহিদা আসতে হবে প্রতিটি থানা ও উপজেলা থেকে এবং বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা তদারকি করতে হবে কেন্দ্র থেকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে। বাজেটের প্রতিটি খাতে চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া এবং তা বাস্তবায়নের দিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এই বাজেটে স্বাস্থ্যসেবা খাত, কৃষি ও শিল্পের কর্মসংস্থানের দিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

এ বাজেটে অর্থায়নের উৎস ধরা হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নিয়ন্ত্রিত কর থেকে বাজেটের ৫৮ দশমিক ১ শতাংশ যা অবাস্তব ও কাল্পনিক।

কালো টাকা সাদা করার সুযোগ সম্মানিত করদাতাদের অবজ্ঞা করা, নিরুৎসাহিত করা হবে যা আগামীতে কর আহরণে ঋণাত্মক প্রভাব ফেলবে।

জাতীয় শিল্পে বিশেষ করে মাঝারি ও ক্ষুদ্রশিল্পের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে প্রণোদনা বাড়াতে হবে। বর্তমান দুর্যোগ সময়ে আয়কর কমানোর সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী। রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি মেটানোই বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হলে গরিব কৃষক ও মৎস্যজীবীসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র পেশাজীবীদের কল্যাণে প্রণোদনার পাশাপাশি তাদের ফসলের ন্যায্য দাম পাওয়ার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। এবারের কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ ও সরকারের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। কিন্তু ঠিক সময় ফসল কিনতে না পারা এবং গোডাউন, হিমাগারের স্বল্পতার কারণে সব ফসল কিনতে না পারার কারণে সব খুদে গরিব কৃষক উপকৃত হতে পারছে না। অতএব গোডাউন ও হিমাগারের সংখ্যা বাড়াতে হবে।

অন্যদিকে আবাসন শিল্পে মধ্যস্বত্বভোগী শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অধিকাংশ ফ্ল্যাট ক্রয়-বিক্রয় হয়। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ একান্ত জরুরি। প্রধানমন্ত্রীর আপসহীন নেতৃত্বে বাংলাদেশ করোনা ভাইরাস দুর্যোগে ঘুরে দাঁড়াবেই।

প্রফেসর ড. প্রিয় ব্রত পাল : অর্থনীতি বিভাগ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়