করোনাভাইরাস ভ্যাকসিনে হঠাৎ আলোর ঝলকানি

ডা. কামরুল হাসান খান
Social Share

যখন গোটা বিশ্ব করোনাভাইরাসের ভয়ংকর থাবায় অনেকটাই পর্যুদস্ত, তখনই গত ৯ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ফাইজার এবং জার্মানির বায়োএনটেক তাদের প্রাথমিক ফলাফল ঘোষণার মাধ্যমে শোনাল করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে প্রথম আশার বাণী। প্রতিষ্ঠান দুটি দাবি করেছে, তাদের তৈরি টিকা ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকর ও নিরাপদ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হালনাগাদ খসড়া তালিকা অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ১৯৮টি সম্ভাব্য ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ চলছে। এর মধ্যে মানবদেহে পরীক্ষার বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে ৪৪টি ভ্যাকসিন। এর মধ্যে ১১টি শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আলোচনার শীর্ষে রয়েছে অক্সফোর্ড, চীনের সিনোভ্যাক, সিনোফার্ম ও ক্যানসিনো, যুক্তরাষ্ট্রের মডার্না, ফাইজার, নোভাভ্যাক্স ও জনসন অ্যান্ড জনসন এবং জার্মানির কিওরভ্যাক।

১১ নভেম্বর পর্যন্ত বিশ্বে করোনা সংক্রমিত শনাক্ত রোগীর সংখ্যা পাঁচ কোটি ১৯ লাখ ৯৮ হাজার ১৪৮ এবং মৃত্যুর সংখ্যা ১২ লাখ ৮২ হাজার ৬৫৬। সুস্থ হয়েছেন তিন কোটি ৬৫ লাখ ১১ হাজার ৭০৯ জন। যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন করে করোনার সংক্রমণ বাড়ছে। সংক্রমণের দ্বিতীয় ধাক্কা ঠেকাতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এরই মধ্যে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। বিধিনিষেধের প্রতিবাদে ইতালির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভের ঘটনাও ঘটেছে। বেলজিয়ামে পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় ভাইরাসে আক্রান্ত চিকিৎসকদেরও সেবা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। লাগামহীনভাবে করোনাভাইরাস সংক্রমণ বৃদ্ধির ফলে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে স্পেন, ফ্রান্স, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ। আশঙ্কা করা হচ্ছে, প্রথম দফার চেয়ে দ্বিতীয় অভিঘাত আরও কঠিন হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এর প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা ও দিল্লিতে এখন করোনার সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী। পাকিস্তানে করোনাভাইরাস সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। বাংলাদেশেও করোনা সংক্রমণ বেড়ে চলেছে। একটি বিষয়ে খুব পরিস্কার থাকা দরকার যে, কোনো টিকা আগামী কয়েক মাসে বিশ্বের চাহিদা অনুযায়ী আসবে না। এমতাবস্থায় যদি যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ না করা হয়, তবে এ সময়ের মধ্যে করোনাভাইরাস সংক্রমণ আরও বাড়বে এবং তার বিরূপ প্রভাবও হবে বহুমুখী।

গত জুলাই মাসে ফাইজার-বায়োএনটেক ছয়টি দেশের ৪৪ হাজার স্বেচ্ছাসেবীর শরীরে তাদের ভ্যাকসিনের তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা শুরু করে। দেশগুলো হলো- যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ব্রাজিল, আর্জেটিনা, দক্ষিণ আফ্রিকা ও তুরস্ক। স্বেচ্ছাসেবীদের মধ্যে অর্ধেককে প্রয়োগ করা হয় করোনা ভ্যাকসিন আর বাকি অর্ধেককে দেওয়া হয় প্লোসেবো (লবণ-পানি)। একটি স্বতন্ত্র, স্বাধীন বিশেষজ্ঞ বোর্ড সব পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে। তাদের পর্যবেক্ষণে ৪৪ হাজার স্বেচ্ছাসেবীর মধ্যে ৯৪ জন কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছেন। বোর্ডের বাইরে স্বেচ্ছাসেবী, চিকিৎসক, প্রতিষ্ঠান নির্বাহী কেউ কোনো তথ্য জানার অধিকার রাখে না। স্বেচ্ছাসেবীরা জানেন না, তাদের মধ্যে কাদের ভ্যাকসিন, কাদের প্লোসেবো প্রয়োগ করা হয়েছে। ৯৪ জনের ক্ষেত্রেও একই বিষয়- কতজন ভ্যাকসিন, কতজন প্লোসেবো পেয়েছেন। যে পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়েছে তাতে বলা হয়েছে, ৯০ শতাংশের ওপরে ভ্যাকসিনটি নিরাপদ ও কার্যকর। এতে আমরা নিশ্চিন্ত হতে পারি যে, খুব স্বল্পসংখ্যক (৯ জন) ভ্যাকসিন গ্রহীতা কভিড-১৯-এ সংক্রমিত হয়েছে।

ফলাফল গ্রহণযোগ্য কিনা- এ প্রশ্নও রয়েছে। হ্যাঁ, এটি একটি গ্রহণযোগ্য ফল। যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসন (এফডিএ) ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা ৫০ শতাংশ হলে তারা জরুরি অনুমোদনের জন্য আবেদন করতে পারবে বলে একটি মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে। এ বিবেচনায় ভ্যাকসিনটি অনেক বেশি কার্যকর। এর আগে বিভিন্ন পর্যায়ের পরীক্ষায় ফাইজার-বায়োএনটেক তাদের ভ্যাকসিনটি প্রমাণের মাধ্যমে নিরাপদ দাবি করেছে। তবে এ ট্রায়াল স্বেচ্ছাসেবীদের মধ্যে আগের ৯৪ জনসহ ১৬৪ জন কভিড রোগী শনাক্ত না হওয়া পর্যন্ত চলবে এবং তারপর ট্রায়ালটি সম্পন্ন হবে। প্রাথমিক ফলাফল খুবই আশাব্যঞ্জক হলেও লাখ লাখ মানুষ ভ্যাকসিনটি ব্যবহার করার পরই পূর্ণ কার্যকারিতা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হবে। পরীক্ষার আওতায় বয়স্ক এবং শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ কারণে আশা করা হচ্ছে তাদের ক্ষেত্রেও যথাযথ কার্যকর হবে।

ফাইজার নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে জরুরি অনুমোদনের জন্য এফডিএর কাছে আবেদন করবে। এরপর দুই মাসের নিরাপদ পরিসংখ্যান এফডিএর কাছে জমা দিতে হবে। এরও পরে ফাইজারকে তাদের প্রতিষ্ঠানের বাইরের একটি বিশেষজ্ঞ উপদেষ্টা কমিটির সঙ্গে তাদের ভ্যাকসিনের নিরাপত্তা, কার্যকারিতা এবং প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা নিয়ে পর্যালোচনা করতে হবে। সব ঠিক থাকলে ভ্যাকসিনটি এ বছরের শেষ নাগাদ ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ যেমন স্বাস্থ্যকর্মী ও বয়স্ক মানুষের শরীরে প্রয়োগ করা হবে।

এ ভ্যাকসিনে জেনেটিক মলিকুলার এমআরএনএ ব্যবহার করা হয়েছে, যা শরীরের কোষ থেকে ভাইরাল প্রোটিন তৈরি করে। এই প্রোটিন তখন শরীরে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা থেকে অ্যান্টিবডি তৈরি করে, যা ভাইরাসকে আক্রমণ করে নিষ্ফ্ক্রিয় করে দেবে। এই ভ্যাকসিন প্রত্যেকের জন্য দুই ডোজ করে দিতে হবে। ভ্যাকসিন ট্রায়ালের ফলাফলসহ বৃত্তান্ত মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত হতে হয়। ফাইজার বলেছে, সমগ্র ট্রায়াল শেষে পূর্ণাঙ্গ ফলাফলসহ তারা প্রকাশনার কাজটি একবারেই করবে। সময় বাঁচানোর জন্য এরই মধ্যে ফাইজার ভ্যাকসিনটি প্রস্তুত প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তারা আশা করছে এ বছরে পাঁচ কোটি ডোজ তৈরি করতে পারবে, যা দিয়ে ২.৫ কোটি মানুষের প্রতিরোধের ব্যবস্থা সম্ভব হবে। ফাইজার আরও আশা করছে, ২০২১ সালের মধ্যে তারা ১৩০ কোটি ডোজ প্রস্তুত করতে পারবে। এরই মধ্যে ফাইজার-বায়োএনটেক ভ্যাকসিন বিতরণের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, কানাডা ও জাপানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে।

ফাইজারের টিকা বনাম মাইনাস ৭০ ডিগ্রি তাপমাত্রা এই টিকার বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে- তাই এর সংরক্ষণ প্রক্রিয়ায় উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। টিকাটি সংরক্ষণে মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (মাইনাস ৯৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট) তাপমাত্রার প্রয়োজন পড়ে। খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বড় শহরের হাসপাতালে এত কম তাপমাত্রার টিকা সংরক্ষণের সুবিধা নেই। ফাইজার বিভিন্ন দেশে ১০ দিনের মধ্যে শুকনো বরফ ব্যবহার করে আকাশপথ বা সড়কপথে টিকা পরিবহনের পরিকল্পনা করছে। এ টিকা নির্ধারিত তাপমাত্রায় ফ্রিজে ছয় মাস পর্যন্ত রাখা যাবে। হাসপাতালে সাধারণভাবে ব্যবহূত ফ্রিজে পাঁচ দিন রাখা যাবে। সংরক্ষণ বিবেচনায় এই টিকা উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশের জন্য কতটা উপযোগী হবে, এটি এখন একটি বড় প্রশ্ন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ অ্যান্টনি ফুসি ফাইজারের ভ্যাকসিনকে স্বাগত ও অভিনন্দন জানিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে ১০ নভেম্বর ২৪ ঘণ্টায় দুই লাখ এক হাজার ৯৬১ জন সংক্রমিত হয়ে নতুন রেকর্ড স্থাপিত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ উদ্বেগজনক জানান দিচ্ছে। তবে আমরা আশাবাদী, একসময় করোনা প্রতিরোধে ভ্যাকসিন আসবে এবং আমাদের রক্ষা করবে। কিন্তু এর জন্য আমাদের অপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। করোনা প্রতিরোধের পরীক্ষিত উত্তম পথ হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। যে কোনো সময়ে, যে কোনো পরিস্থিতিতে ঘরের বাইরে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করব, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখব এবং ভালো করে সাবান-পানি দিয়ে নিয়মমাফিক হাত ধোব।

অধ্যাপক ও সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়