করোনাভাইরাস: ইউরোপে লকডাউন পরিস্থিতিতে কেমন কাটছে বাংলাদেশিদের জীবন

ঘরে বসে পরিবারের সাথে সময় কাটাচ্ছেন প্যারিসের বাসিন্দা তুহিনা আক্তার রিমা
Social Share

করোনাভাইরাসের বিশ্ব-মহামারিতে ইউরোপ হয়ে উঠেছে এটির নতুন এপিসেন্টার। ইতালি, স্পেন, জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য থেকে শুরু করে প্রায় সবদেশেই এই মহামারি নিয়ন্ত্রণে ‘লকডাউন’ অর্থাৎ সবকিছু বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

ইউরোপের প্রায় সবদেশেই বাংলাদেশিরা আছেন। কোথাও কম, কোথাও বেশি। করোনাভাইরাসের মহামারিতে অবরুদ্ধ হয়ে থাকা এই বাংলাদেশিরা সেখানে কেমন আছেন? কীভাবে তাদের দিন কাটছে?

ইতালির ত্রিয়েস্তে আইরিন পারভীন খান ও তার পরিবার

‘জানিনা কবে মুক্তি পাব’?

আইরিন পারভীন খান, ত্রিয়েস্ত, ইতালি

আমরা আছি ইতালির উত্তর প্রান্তে, ত্রিয়েস্ত শহরে। এটি ইতালির ফ্রিউলি ভেনেজিয়ে জুলিয়া প্রদেশের রাজধানী। অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের তীরে সুন্দর একটি শহর। ইতালির সবচেয়ে সুন্দর শহরগুলোর একটি। এখানে গত বিশ বছর ধরে কিছু বাংলাদেশি আছে। প্রায় ১০০ পরিবার এখানে থাকে।

আমরা এখানে একটা গ্রোসারি স্টোর চালাই। কাজেই যখন ইতালিতে করোনাভাইরাসের কারণে লকডাউন শুরু হলো, আমরা চিন্তায় পড়ে গেলাম। আমাদের এই ব্যবসাটার কী হবে সেটা নিয়ে চিন্তা।

ইতালিতে লকডাউন ধাপে ধাপে এসেছে। শুরুতে স্কুল বন্ধ করা হয়েছে। তখন চিন্তা শুরু হলো আমার মেয়েকে নিয়ে। কারণ এবছর আমার মেয়ের ফাইনাল পরীক্ষা দেয়ার কথা। ওরা কীভাবে পড়ালেখা করবে।

স্কুলের পর দেখা গেল বার-রেস্টুরেন্ট সব বন্ধ করে দেয়া হলো। এরপর বলা হলো কেউ কাজেও যেতে পারবে না। কেবলমাত্র সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজনীয় সামগ্রীর দোকানগুলো খোলা থাকবে।

আমাদেরটা যেহেতু গ্রোসারি শপ এবং এথনিক শপ, শুরুতে ভয় ছিল যে এটি খোলা রাখতে পারবো কি না। আমি যোগাযোগ করলাম, যিনি আমাদের কাজকর্ম দেখেন তার সঙ্গে। তিনি জানালেন খোলা রাখতে পারবো।

প্রথমে কথা ছিল লকডাউন হবে ১৫ দিনের জন্য। এখন একটা ব্যবসা যদি ১৫ দিন বন্ধ থাকে, সেটার ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে লাগবে তিনমাস।

প্রতিদিন যখন আমাদের গ্রোসারি শপে যাই, তখন দেখি পথে-ঘাটে কোন মানুষ নেই। সাধারণত আমি পায়ে হেঁটে যাই। একদিন বাসে উঠলাম, দেখি পুরো বাসটাই ফাঁকা। এই শহরে আমি আছি গত ১৪ বছর ধরে। এই শহরের পথঘাট, গাছপালা সব কিছুই খুব আপন। খুব অস্বস্তিকর লাগছিল, খুব ভয় লাগছিল সেই সময়টা। খুব খারাপ লাগছিল, পরিচিত মানুষগুলোর জন্য খারাপ লাগছিল।

কেনাকাটা করার জন্য সুপারমার্কেটে যখন যাই, তখন একটা দুরত্ব রেখে দাঁড়াতে হয়। তখন ভয় লাগে। মনে হয় এখান থেকে পালিয়ে যাই।

ইতালিতে এখনো পর্যন্ত খাবার দাবার নিয়ে সমস্যা হচ্ছে না। কিন্তু তারপরো কেমন একটা আতঙ্কজনক অবস্থা।

কথা ছিল ৩রা এপ্রিল পর্যন্ত লকডাউন চলবে। কিন্তু আজকে সিদ্ধান্ত এসেছে যে ইস্টার সানডে পর্যন্ত চলবে। জানিনা কবে আমরা এ থেকে মুক্তি পাব।

জার্মানিতে আটক অবস্থায় সময় কাটছে প্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের

স্বাধীনতার উপলব্ধি

মিফতাহুল ইসলাম, সাদিয়া চৌধুরী, আফতাব মাহমুদ ও আসিফুর রহমান, জার্মানি

আমরা যে শহরটাতে থাকি, সেটা সাবেক পূর্ব জার্মানির একটা বিশ্ববিদ্যালয় শহর। নাম ইয়েনা।

এটি একটি ছোট নিস্তরঙ্গ শহর। অনেক বাংলাদেশি ছাত্র-ছাত্রী পড়তে এসেছে এখানে। আমরা চারজন এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী।

এখানে এখন সব বন্ধ। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ, ল্যাব বন্ধ। পরিস্থিতি খুবই খারাপ। সারাক্ষণ ঘরে বসে থাকা ছাড়া আর কিছু করার নেই। যখন লকডাউন শুরু হলো, তখন প্রথম কয়েকদিন ভালো লাগতো। ঘরে বসে বসে মুভি দেখতাম। কিন্তু তারপর খুব নিঃসঙ্গ বোধ করতে শুরু করলাম আমরা।

এখন চেষ্টা করছি বাসায় বসে সময়টা কী কাজে লাগানো যায়। কেউ কম্পিউটার কোডিং শেখার চেষ্টা করছি। কেউ ইউটিউব দেখে বাংলাদেশি রান্না শেখার চেষ্টা করছি। লকডাউনের পর আমরা বুঝতে পারছি ফ্রিডম বা স্বাধীনতা বিষয়টা কত জরুরি।

কদিন আগে এখানে ফায়ার অ্যালার্ম বেজে উঠেছিল। তখন সবাইকে দৌড়ে বেরুতে হয়েছে। লোকজনকে দেখে মনে হলো ফায়ার অ্যালার্ম বাজায় তারা দারুণ খুশি। একটু ঘরে বাইরে এসে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেয়ার একটা সুযোগ তো পাওয়া গেল।

এখানে এখন স্প্রিং শুরু হয়েছে। দিন বড় হচ্ছে। শীত কমছে। ইউরোপে মানুষ এরকম সময়ের অপেক্ষায় থাকে সারাবছর। কিন্তু বসন্ত আসলেও আমরা বাইরে যেতে পারছি না।

আমাদের মধ্যে একজন সাইক্লিং পছন্দ করে। দলবেঁধে আমরা সাইকেলে বেড়াতে যাই। কিন্তু এবার সব বন্ধ। ফুটবল, বন্ধুদের আড্ডা- সব বন্ধ।

আগে দেশে পরিবার-আত্মীয়-বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে কথা হতো খুব কম। কিন্তু এখন হাতে অফুরন্ত সময়, সারাদিন কথা হয়।

দেশ থেকে আমাদের মা-বাবারা কান্নাকাটি করেন। বলেন দেশে চলে আয়। কিন্তু আমাদের আসলে বাংলাদেশের জন্যই বেশি চিন্তা হয়। এই করোনাভাইরাসের মোকাবেলায় বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত, সেটা নিয়ে বেশি চিন্তা হয়।

গত ১১ বছর ধরে মাদ্রিদে রয়েছেন সাইফুল আমিন কিরণ

অবৈধদের দারুণ কষ্ট

সাইফুল আমিন কিরণ, মাদ্রিদ, স্পেন

আমি গত ১১ বছর ধরে মাদ্রিদে থাকি। আমার বয়স এখন ৩৮। এখানে স্ত্রী এবং দুই কন্যা শিশু নিয়ে আমাদের সংসার। আমি মাদ্রিদের একটি সুপারস্টোরে কাজ করি।

করোনাভাইরাসের কারণে গত ১৩ই মার্চ থেকে এখানে পুরো লকডাউন, সব বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। করোনাভাইরাসে স্পেনে প্রতিদিন শত শত মানুষ মারা যাচ্ছে।

এর মধ্যে মাদ্রিদের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। প্রথম যখন চীনে এবং তারপর ইতালিতে করোনাভাইরাস ছড়াতে শুরু করলো, তখন এখানকার মানুষ খুব বেশি পাত্তা দেয়নি। কিন্তু এখন এই বিপদ এমন ভয়ংকর চেহারা নিয়েছে যে সবার মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়েছে।

মাদ্রিদ এখন বসন্তকাল। স্বাভাবিক সময়ে এখানে বছরের এই সময়টায় রাত ১২ টার আগে কেউ ঘরে ফেরে না।

কিন্তু এখন দিনের বেলাতেই রাস্তাঘাট খাঁ খাঁ করছে। যখন কাজে যাই, মেট্রো একেবারে খালি। আসার সময় দেখা যায় খালি বাসটিতে হয়তো আমিই একমাত্র যাত্রী। সবাই ঘরের মধ্যে আটকে আছে। কেউ বেরুতে পারছে না। বাচ্চারা বাইরে খেলতে যেতে চায়। বিশেষ করে আমার বড় মেয়েটা। কিন্তু যেতে পারে না।

কাজ শেষে যখন বাড়ি ফিরি তখন আমার ছোট মেয়েটা দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরতে চায়। কিন্তু আমাকে আগে তাড়াতাড়ি বাথরুমে ঢুকে দরোজা বন্ধ করতে হয় নিজেকে পরিস্কার করার জন্য।

মাদ্রিদ্রে প্রায় পাঁচ হাজার বাংলাদেশি মানুষ আছে। এদের মধ্যে অনেকেই বৈধ নয়, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই। তারা এখন ভীষণ কষ্টে আছে।

অবৈধ বলে রাস্তায় বেরুতেই পারে না, পুলিশ ধরে। খাওয়া দাওয়াসহ সব কিছুতেই সমস্যায় আছে তারা। কিছু বাংলাদেশি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা তাদের সাহায্য করার চেষ্টা করছে।

তুহিনা আক্তার রিমা

পরিবারের কাছে থাকার সুযোগ

তুহিনা আক্তার রিমা, প্যারিস, ফ্রান্স

আমি প্যারিসে আছি বহু বছর ধরে। আমাদের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে, আমি এবং আমার স্বামী মিলে চালাই। লকডাউনের কারণে এটি এখন বন্ধ রাখতে হয়েছে।

আমরা কেউ এখন বাসা থেকে বের হতে পারছি না। ফ্রান্সে নিয়ম করা হয়েছে যে ঘর থেকে বাইরে বেরুলেই একটা ফর্ম পূরণ করে হাতে রাখতে হবে, সেটাতে উল্লেখ থাকতে হবে কেন ঘর থেকে বেরুতে হলো। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনার জন্য বা ফার্মেসিতে যাওয়ার জন্যই কেবল বাইরে বেরুনো যাবে। নিয়ম ভাঙ্গলে জরিমানা করা হয়।

আমার খুবই দমবন্ধ লাগছে। বাচ্চারা স্কুল করছে অনলাইনে। বাকী সময় তাদের ব্যস্ত রাখার জন্য আমাদের কিছু এক্টিভিটি তাদের জন্য চিন্তা করে রাখতে হচ্ছে।

সাধারণত আমাদের সকাল শুরু হয় অনেক ভোরে। আর ঘরে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা। তখন এত ক্লান্ত থাকি যে বাচ্চাদের যথেষ্ট সময় দেয়া হয়না। কিন্তু এখন সব পাল্টে গেছে নাটকীয়ভাবে।

আমার মনে হয় না আমার বাচ্চাদের সঙ্গে এত সময় কখনো কাটিয়েছি। এত দীর্ঘ সময় কাটাইনি। অনেক ভয় অনেক আতংকের মধ্যে এটা একটা বড় পাওয়া।

আমি মনে করি করোনাভাইরাসের কারণ পরিবারেরর সদস্যদের অনেক কাছাকাছি আসার একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে।

আমার ছেলের বয়স ছয় বছর, ও অনেক বাংলা শিখেছে এই কদিনে। আমার মনে হচ্ছে একসময় যখন এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতিটা বদলে যাবে, তখন একটা সুন্দর পৃথিবী হয়তো আমরা পাব। স্বার্থপরতা হয়তো অনেক কমে যাবে।

আমরা মানুষের কষ্ট যেভাবে অনুধাবন করছি, একজন আরেকজনের খোঁজখবর নিচ্ছি, আমাদের মানবিক গুনাবলী হয়তো আরো বেড়ে যাবে।

ইতালিতে পর্যটন ব্যবাসায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন রোমের বাংলাদেশি নাগরিক জাকারিয়া কাজী

প্রাণচঞ্চল রোম এখন মৃতপুরী

জাকারিয়া কাজী, রোম, ইতালি

আমি দশ বছর ধরে রোমে থাকি। আমি এখানে ট্যুরিজমের ব্যবসা করি, পাশাপাশি কিছু সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত।

করোনাভাইরাসে ইতালি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ দেশ। বিশেষ করে উত্তর ইতালির অবস্থা খুব খারাপ। সেই তুলনায় রোমের পরিস্থিতি অতটা খারাপ নয়।

ইতালিতে বহু বাংলাদেশি, বেশিরভাগই রোমে। আমাদের জীবনযাত্রা স্থবির এখানে। আমরা ঘরবন্দী হয়ে আছি। কাজ নেই। কর্মহীন সবাই। তবে এখানে সরকার দায়িত্বশীল। একধরণের সামাজিক নিরাপত্তা আছে। যাদের কাজ নেই, তাদের সরকার সহায়তা দিচ্ছে। তহবিল গঠন করা হয়েছে। যারা ব্যবসা করে, তাদেরকেও সহয়াতা দেয়া হবে। খাদ্য সাহায্য দেয়া হবে।

তবে যাদের কাগজপত্র নেই, তাদের হয়তো একটু অসুবিধা হচ্ছে। এখানকার স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলো তাদের সাহায্য করার চেষ্টা করছে।

এ মাসের ১৩ তারিখ পর্যন্ত লকডাউন অব্যাহত থাকবে। মানুষ আতংকের মধ্য আছে, ভয়ে আছে। এর মধ্যেই জীবন চলছে।

রোম এখন মৃতপুরী। আমার খুব খারাপ লাগে।

এটা ছিল একটা প্রাণ চঞ্চল শহর। দিনরাত সরগরম থাকতো।

একটা প্রবাদ ছিল, অল রোড লিডস টু রোম। পৃথিবীর সব রাস্তা রোমে এসে শেষ হয়। সত্যিই তাই।

পৃথিবীর নানা দেশ থেকে মানুষ এখানে আসে, আমরা তাদের শহর দেখাতে নিয়ে যাই।

পর্যটন আমার পেশা শুধু নয়, আমার নেশাও। এখন সব স্থবির।

পর্যটন সংস্থাগুলো বন্ধ, আমরাও বেকার। আমাদের আশা, আবার আমরা ঘুরে দাঁড়াবো, আগের জীবনে ফিরো আসবে।