করোনাভাইরাস: অ্যাপের মাধ্যমে কন্টাক্ট ট্রেসিং কীভাবে কাজ করবে?

Social Share

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে খুব শিগগিরই যুক্তরাজ্যের লাখ লাখ মানুষকে আহ্বান জানানো হবে যে তারা যেন তাদের চলাচল ট্র্যাক বা চিহ্নিত করে।

করোনাভাইরাসে আক্রান্তরা যাদের সংস্পর্শে এসেছেন, তাদের খুঁজে বের করতে ১৮ হাজার মানুষ নিয়োগের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাজ্যের সরকার। এর সাথে সাধারণ জনগণকেও সংযুক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হবে।

তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে কন্টাক্ট ট্রেসিং কীভাবে কাজ করে? আপনাকেও কি অংশ নিতে হবে? আর এতে তথ্য দিলে সেগুলো কি সুরক্ষিত থাকবে?

কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং কী?

কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং হচ্ছে একটি পদ্ধতি যা সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ব্যবহার করা হয়। এটা সাধারণত যৌন রোগের ক্লিনিকে ব্যবহার করা হয়। সেখানে রোগীদের বলা হয় তারা যেসব মানুষের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়েছেন তাদের সাথে যোগাযোগ করতে।

করোনাভাইরাস মহামারির ক্ষেত্রে, যেসব মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছেন তাদেরকে স্বেচ্ছা আইসোলেশনে যেতে বলা হয়।

এটা সাধারণত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির বন্ধু এবং পরিবারের সদস্যদের ফোনের মাধ্যমে জানানো হয়। সাথে একটা স্বয়ংক্রিয় লোকেশন ট্র্যাকিং মোবাইল অ্যাপও সংযুক্ত করা হয়।

করোনাভাইরাসের মারাত্মক প্রাদুর্ভাবের শিকার দেশগুলোতে এরই মধ্যে কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন হংকং, সিঙ্গাপুর, জার্মানি।

যুক্তরাজ্য মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং অ্যাপ চালু করার পরিকল্পনা করছে। আশা করা হচ্ছে যে, কয়েক সপ্তাহ ধরে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কারণে প্রাদুর্ভাব খুঁজে বের করা বা ট্র্যাক করাটা সহজ হবে।

সিঙ্গাপুরে কন্টাক্ট ট্রেসিং অ্যাপ ব্যবহার করা হচ্ছে।

যুক্তরাজ্যে কন্ট্যাক্ট ট্রেসিংটা কেমন হবে?

১৮ হাজার সদস্যের শক্তিশালী দলটিতে তিন হাজার সরকারি কর্মকর্তা ও স্বাস্থ্য কর্মী থাকবেন। বাকি ১৫ হাজার থাকবে যারা ফোন কল সেবা দিবে।

তারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের সাম্প্রতিক চলাফেরা সম্পর্কে খোঁজ খবর নেবে এবং তারপর তারা যাদের সাথে মেলামেশা করেছে তাদেরকে ফোন করে খবর নেবে।

এই টেলিফোন ব্যবস্থার সাথে একটি ট্রেসিং অ্যাপ থাকবে যা পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে স্মার্টফোনে ডাউনলোড করা যাবে।

ফ্রি এই অ্যাপটির ব্যবহারকারীরা যখন একে অন্যের কাছাকাছি আসে তখন এটি ব্লুটুথ ব্যবহার করে ট্র্যাক করে। যার ফলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং প্রক্রিয়া চালু হয়ে যায়।

তবে কোন ব্যবহারকারী করোনাভাইরাসের সংক্রমণের শিকার হলে ব্যক্তির সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে অ্যাপটি ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা বিভাগকে বিষয়টি অবহিত করবে।

তারা যদি আক্রান্ত হওয়ার তথ্য জানায় তাহলে ওই ব্যক্তি যার যার সাথে সাম্প্রতিক সময়ে সংস্পর্শে এসেছিল তাদের সবাইকে অ্যাপটি সংকেত পাঠাবে এবং তাদেরকে কোয়ারেন্টিন কিংবা করোনাভাইরাসের পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেবে।

যাদের কাছে স্মার্টফোন নেই, তারা এর বিকল্প হিসেবে ব্লুটুথ সম্বলিত রিস্টব্যান্ড ব্যবহার করতে পারবেন যেগুলো অন্যান্য দেশে লকডাউন ভাঙার তথ্য শনাক্ত করতে ব্যবহার করা হয়।

এগুলো কি লকডাউন সমাপ্ত করতে সহায়তা করবে?

অনেক দেশে কঠোরতা সরিয়ে নেয়ার অংশ হিসেবে অন্যান্য পদক্ষেপের পাশাপাশি কন্ট্যাক্ট ট্রেসিংকে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় কখনো লকডাউন করা হয়নি। কারণ তারা শুরুর দিকেই কৌশল হিসেবে বিস্তর আকারে কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং এবং গণহারে পরীক্ষা করেছিল।

দেশটি শুধু এর নাগরিকদের নিজেদের চলাচলের তথ্যই দিতে বলেনি, সাথে সাথে তাদের ক্রেডিট কার্ডের লেনদেন, সিসিটিভি ফুটেজ এবং মোবাইল ফোন ট্র্যাক করে তারা কোথায় কোথায় ছিল সেগুলো খুঁজে বের করেছে। যার কারণে একদিনে সর্বোচ্চ ৯০০ জন আক্রান্ত হওয়ার পর সেখানে এখন প্রতিদিন মাত্র হাতে গোনা কিছু মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়ায় কোবিড-১৯ ট্রেসিং করার অ্যাপ চালু করা হয়েছে।

যদি আসলেই ব্যাপকভাবে কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং সম্ভব হয় তাহলে যুক্তরাজ্যেও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা যেতে পারে। যদিও নাগরিকরা এতো ব্যাপক আকারে নিজেদেরকে ট্র্যাক করাবে বলে মনে হচ্ছে না।

মহামারির শুরুর দিকে যুক্তরাজ্য সরকার কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং কার্যকর করেছিল।

যাই হোক, লকডাউনের কারণে চলাচল এমনিতেই কমে যাওয়ার কারণে মনে হচ্ছে যে, নতুন করে সংক্রমণ হলে তা খুঁজে পাওয়া সহজ হবে।

ফোন ট্রেস করাটা খুব কঠিন এবং সময় সাপেক্ষ হতে পারে। আয়ারল্যান্ডে যারা ট্রেসিং করার দায়িত্ব পালন করেন তারা বলছেন যে, প্রতিজন আক্রান্ত ব্যক্তিকে কমপক্ষে ৪০টি করে কল দিতে হচ্ছে।

মোবাইল অ্যাপটি তুলনামূলক সহজ, কিন্তু এর মাধ্যমে ভাইরাসের সংক্রমণ নির্মূল করতে হলে এটি ব্যাপকহারে ব্যবহার করতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা বিভাগকে বলেছে যে, স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৮০ভাগ এবং মোট জনসংখ্যার ৬০ ভাগকে সক্রিয়ভাবে এই অ্যাপ ব্যবহার করতে হবে।

তুলনা হিসেবে বলা যায়, যুক্তরাজ্যের স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৬৭ভাগ বার্তা পাঠানোর অ্যাপ হোয়াটসঅ্যাপ ডাউনলোড করেছে।

এছাড়া মানুষকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া কিংবা এর উপসর্গে ভোগার তথ্য এনএইচএস-কে জানানোর বিষয়ে সৎ হতে হবে।

সরকার এই তথ্য নিয়ে কী করবে?

সরকার এবং তৃতীয় কোন পক্ষকে নিজেদের তথ্য দেয়া নিয়ে সবাই খুশি নয়।

নাগরিক অধিকার বিষয়ক সংগঠন লিবার্টি বলেছে, এর ঝুঁকির বিষয়টি সরকারকে গুরুত্বের সাথে নিতে হবে এবং লকডাউন শেষ করা কিংবা কাজে ফিরে যাওয়ার শর্ত হিসেবে অ্যাপটির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা উচিত হবে না।

স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের ডিজিটাল বিভাগ এনএইচএসএক্স বলছে, “লাখ লাখ মানুষের অ্যাপটির উপর বিশ্বাস তৈরি হতে হবে এবং এর দেয়া নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।”

এটি আরো বলছে, যে তথ্য সংগ্রহ করা হবে তা শুধু স্বাস্থ্য এবং গবেষণার কাজে ব্যবহার করতে হবে এবং অ্যাপটি যেকোন সময় ডিলিট করার সুযোগ থাকতে হবে।

যুক্তরাজ্যের এই অ্যাপটি একটি কেন্দ্রীয় মডেল ব্যবহার করে বানানো হবে যার মানে হচ্ছে মিল করার প্রক্রিয়াটি একটি কম্পিউটার সার্ভারে অনুষ্ঠিত হবে।

এর বিকল্প একটি মডেলের প্রস্তাব দিয়েছে অ্যাপল এবং গুগল, যেখানে মিল করার প্রক্রিয়াটি ব্যবহারকারীর হ্যান্ডসেটেই সম্পন্ন হবে।

এই টেক জায়ান্টরা বলছেন, তাদের ভার্সনটি হ্যাকার এবং কর্তৃপক্ষের জন্য কম্পিউটারের সার্ভারে লগ ইন করে সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির তথ্য ব্যবহার করার কাজটিকে কঠিন করবে।

তবে এনএইচএসএক্স বলছে, কেন্দ্রীয় একটি ব্যবস্থার আওতায় থাকলে তা রোগটির প্রসার সম্পর্কে আরো বেশি নির্ভরযোগ্য তথ্য দেবে এবং অ্যাপটিকেও আরো দক্ষতার সাথে কাজ করতে সহায়তা করবে।