করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে

Social Share

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের ভয়াল থাবায় কাঁপছে বিশ্ব। ইতোমধ্যে ভাইরাসটির সংক্রমণ ঘটেছে অন্তত ৯১টি দেশে। শুক্রবার পর্যন্ত এসব দেশে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে গেছে। আর চীনসহ ১৬টি দেশে মারা গেছে ৩ হাজার ৪৬০ জনের বেশি মানুষ। নিকট অতীতে কোনো মহামারিতে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়নি।

শুক্রবার পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৫৮৩ জন, মারা গেছে ৩ হাজার ৪৬০ জন। এর মধ্যে গতকালই ৩ হাজার ৩ জনের বেশি আক্রান্ত এবং ১১০ জনের বেশি মারা গেছে। আক্রান্তদের মধ্যে ৫৫ হাজার ৮৬৩ জন আরোগ্য লাভ করেছে। খবর বিবিসি, এএফপি, নিউইয়র্ক টাইমস ও সিএনবিসির।

ইতালিতে শুক্রবার করোনভাইরাসে আরও ৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। ফলে দেশটিতে মৃতের সংখ্যা পৌঁছল ১৯৭ জনে। বৃহস্পতিবারও দেশটিতে মারা যায় ৪১ জন।

চীনের বাইরে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে ইতালিতে। শুক্রবার সেখানে আরও ৭৭৮ জন আক্রান্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে সেখানে ৪ হাজার ৬৩৬ জন আক্রান্ত হয়েছে। ইতালি থেকেই পুরো ইউরোপ এবং আফ্রিকা ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এ ভাইরাস।

ইরানে শুক্রবার আরও ১৭ জনের মৃত্যু এবং এক হাজার ২৩৪ জন আক্রান্ত হয়েছে। সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা পৌঁছেছে ৪ হাজার ৭৪৭ জনে। ইরানে গতকাল পর্যন্ত মারা গেছে ১৪২ জন। তবে দেশটির প্রকৃত অবস্থা আরও ভয়াবহ বলে মনে করা হচ্ছে।

নতুন করে করোনার সংক্রমণ ঘটেছে ভ্যাটিকান, নেপাল, পেরু, স্লোভাকিয়া, সার্বিয়া ও ক্যামেরুনে। নেদারল্যান্ডসে প্রথম মৃত্যু হয়েছে করোনায়। করোনা আতঙ্কে শুক্রবার এশিয়া ও ইউরোপের শেয়ারবাজারে বড় দরপতন হয়। করোনার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে শুক্রবার জুমার নামাজ বিঘ্নিত হয়। সরকারের নির্দেশে ইরানের ৬০ হাজার মসজিদে জুমার নামাজ হয়নি।

করোনায় আশাব্যঞ্জক খবর এসেছে চীনের উহান থেকে। দুই মাস আগে চীনের এই অঞ্চলেই প্রথম করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়। হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহানে নতুন রোগী আরও কমেছে। হুবেই প্রদেশের মধ্যে শুক্রবার উহান ছাড়া আর কোথাও নতুন সংক্রমণ ঘটেনি।

মার্চের মাঝামাঝি উহানে নতুন রোগীর সংখ্যা শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে বলে আশা করছেন চীনা চিকিৎসকরা। ফলে শিগগির ওই অঞ্চলের অবরুদ্ধ অবস্থার অবসান ঘটবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন এক কর্মকর্তা। এক মাসের বেশি সময় ধরে কার্যত অবরুদ্ধ ছিল হুবেইর সাড়ে ৫ কোটি মানুষ। কিন্তু চীনের বাইরে প্রতিদিনই নতুন নতুন দেশে এ ভাইরাসের সংক্রমণের তথ্য আসছে। দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ভারতে বাড়ছে নতুন রোগীর সংখ্যা।

চীনের জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন গতকাল জানায়, দেশটির মূল ভূখণ্ডে আরও ১৪৩ জনের শরীরে সংক্রমণ ধরা পড়েছে। তাদের মধ্যে ১২৬ জনই হুবেই প্রদেশের। তাতে দেশটিতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা পৌঁছেছে ৮০ হাজার ৫৫২ জনে। চীনে বৃহস্পতিবার আরও ৩০ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে করোনাভাইরাস। সব মিলিয়ে চীনে করোনাভাইরাসে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪২ জনে। চীনের জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন বলছে, সেখানে যারা এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিল, তাদের মধ্যে ৫৩ হাজার ৭২৬ চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরে গেছে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় ছয় হাজার ৬০০ জনের মধ্যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে, মারা গেছে ৪২ জন। আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রেও। সেখানে শুক্রবার পর্যন্ত ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০টি রাজ্যে আক্রান্ত হয়েছে দুই শতাধিক লোক। জাপানে নতুন করে ৩১৭ জনসহ ১ হাজার ৪৫ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়েছে, মারা গেছে ১২ জন। ফ্রান্সে আরও দুইজন মারা গেছে। যুক্তরাজ্যে আক্রান্তের সংখ্যা পৌঁছেছে ১৬৩ জনে। শুক্রবার পর্যন্ত ফ্রান্সে ৯, স্পেনে ৫; হংকং, অস্ট্রেলিয়া ও ইরাকে দু’জন করে এবং যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনে একজন করে মারা গেছে।

হিমালয়ের ছোট্ট দেশ ভুটানে একজনের দেহে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। বৃহস্পতিবার ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক ফেসবুক পোস্টে জানানো হয়, ৭৬ বছর বয়সী এক মার্কিন পর্যটক সেখানে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কা, নেপাল, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ভারতে আগেই পৌঁছেছে করোনাভাইরাস। এর মধ্যে ভারতে এ ভাইরাসের সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি ধরা পড়েছে। শুক্রবার নতুন করে আরও একজনের দেহে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়ার পর আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩১ জনে। দিল্লিতে আক্রান্ত ওই ব্যক্তি সম্প্রতি থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় বেড়াতে গিয়েছিলেন। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে এখনও কারও মধ্যে সংক্রমণের তথ্য আসেনি।

এদিকে করোনা নিয়ে কূটনৈতিক বিবাদে জড়িয়ে পড়েছে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আসা পর্যটকদের দুই সপ্তাহ কোয়ারেন্টাইনে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাপান। সিউল একে ‘অযৌক্তিক, বাড়াবাড়ি এবং অত্যন্ত দুঃখজনক’ বলে মন্তব্য করেছে। এ ব্যাপারে প্রতিবাদ জানাতে শুক্রবার জাপানি রাষ্ট্রদূতকে দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বলেছে, করোনার কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতির সর্বোচ্চ ৩৪ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের ক্ষতি হতে পারে। বহুজাতিক ব্যাংকটির মতে, করোনায় সর্বনিম্ন ক্ষতি হবে ৭ হাজার ৭০০ কোটি ডলার, যা বিশ্বের জিডিপির ০.১ শতাংশ।

সার্স ও মার্স পরিবারের সদস্য করোনাভাইরাসের সংক্রমণে ফ্লুর মতো উপসর্গ নিয়ে যে রোগ হচ্ছে তাকে বলা হচ্ছে কভিড-১৯। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এখন পর্যন্ত এ রোগে মৃত্যুহার ৩.৪ শতাংশ, যেখানে মৌসুমি ফ্লুতে মৃত্যুহার থাকে ১ শতাংশের নিচে। তবে করোনায় ৯ বছরের নিচের কেউ মারা যায়নি। প্রবীণদের মধ্যেই মৃত্যুহার বেশি।

করোনাভাইরাস মূলত শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণ ঘটায়। এর লক্ষণ শুরু হয় জ্বর দিয়ে, সঙ্গে থাকতে পারে সর্দি, শুকনো কাশি, মাথাব্যথা, গলাব্যথা ও শরীর ব্যথা। সপ্তাহখানেকের মধ্যে দেখা দিতে পারে শ্বাসকষ্ট। উপসর্গগুলো হয় অনেকটা নিউমোনিয়ার মতো। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো হলে এ রোগ কিছুদিন পর এমনিতেই সেরে যেতে পারে। তবে ডায়াবেটিস, কিডনি, হৃদযন্ত্র বা ফুসফুসের পুরোনো রোগীদের ক্ষেত্রে ডেকে আনতে পারে মৃত্যু। করোনাভাইরাসের কোনো টিকা বা ভ্যাকসিন এখনও তৈরি হয়নি। ফলে এমন কোনো চিকিৎসা এখনও মানুষের জানা নেই, যা এ রোগ ঠেকাতে পারে। আপাতত একমাত্র উপায় হলো আক্রান্তদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, চীনে যে গতিতে সংক্রমণ ছড়িয়েছে, চীনের বাইরে এই সংক্রমণ ১৭ গুণ বেশি। পরিস্থিতির ভয়াবহতা সম্পর্কে সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রস অ্যাডানম গেব্রেয়েসুস বলেছেন, ‘এ ভাইরাসকে যে কোনো উপায়ে ঠেকাতে হবে। এটা আত্মসমর্পণের সময় নয়। কোনো অজুহাতের সময় নয়। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই কঠিন পরিস্থিতির বিরুদ্ধে সবাইকে রুখে দাঁড়াতে হবে।’