করোনাকাল -– ব্যবস্থাপনায় সম্পদ নাকি দায়িত্ববোধের অভাব?

Social Share

এম বি আখতার
উন্নয়ন কর্মী ও বিশ্লেষক

গত ২ মাসের অধিককাল থেকে বাংলাদেশের সকল প্রতিষ্ঠান, প্রতিটি পরিবার, প্রতিটি ব্যক্তি বৈষয়িক মহামারী করোনা দ্বারা প্রভাবিত। সমগ্র উন্নত বিশ্বে দেশসমূহ করোনা মহামারি স্বাস্থ্যগত সেবাসহ করোনা প্রতিষেধক আবিস্কার এবং ক্ষতিগ্রস্থ দরিদ্র মানুষের সেবায় নিয়োজিত।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের পত্রপত্রিকার খবর আমাদের উদ্বিগ্ন করছে কারন সরকারের সীমিত সম্পদের মধ্যেও প্রদেয় ত্রাণ সঠিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ জনগণের নিকট পৌছাচ্ছে না। দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেক নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিবৃন্দ দুর্নীতির সাথে জড়িত হচ্ছেন। স্বাস্থ্য খাতে আমাদের দেশের বড় বড় সরকারী অবকাঠামোর পাশাপাশি গড়ে উঠেছে বেসরকারী বড় বড় স্বাস্থ্যসেবাদানকারী অনেক প্রতিষ্ঠান; কিন্তু গর্ভবতী মাকে সন্তান জন্মদিতে হচ্ছে রিক্সাভ্যানের উপর, হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু হচ্ছে এ্যাম্বুলেন্সের ভিতরে। উপসানালয় গুলোতে মানুষের প্রবেশাধিকারের জন্য আকুল আবেদন যেমন এদিকে, অন্যদিকে করোনা উপসর্গ রয়েছে এমন মা’কে জঙ্গলে ফেলে দিয়ে আসছে নিজ সন্তানেরা। পরিবারের নারী-পুরুষ সকলের প্রচেষ্ঠায় যখন আমরা নিরাপদে থাকার আহবান করছি ঠিক সেই সময় দেখা যাচ্ছে পরিবারে নারীর উপর নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে ৬৫% ভাগ (সূত্র স্টেপস টুওয়ার্ডস এর সমীক্ষা)। সরকার যখন প্রয়োজন না হলে ঘরের বাহিরে না যাওয়ার জন্য তখন দেখা যাচ্ছে দোকানের শাটার বন্ধ রেখে দোকানের ভীতরে নারী-পুরুষ-শিশুদের ঈদের বাজারের জন্য ব্যস্ততা। বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্রমান্বয়ে বড় হচ্ছে, গত ১০ বছর থেকে আমাদের গড় প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) শতকরা ৬ শতাংশের উপরে। দরিদ্রমানুষের সংখ্যা কিংবা হার কমছে, গ্রামীণ ও শহরের অর্থনীতির মধ্যে বৈষম্য থাকলেও অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে দরিদ্র মানুষের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিবছর বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) এর অধীনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নির্বাহী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কর্মকর্তা, চিকিৎসক, শিক্ষক এবং পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োগ হচ্ছে। সরকারী বা বেসরকারী পর্যায়ে ব্যাংকের পরিধি এবং সেবা বৃদ্ধি হচ্ছে, এনজিও সেক্টরে লক্ষ কর্মীর মাধ্যমে বেসরকারী পর্যায়ে উন্নয়ন কার্যক্রম ও ক্ষুদ্র ঋণের মাধ্যমে দারিদ্রতা বিমোচনের প্রচেষ্টা উল্লেখযোগ্য এবং স্বীকৃত। এই বাস্তবতা ও পরিস্থিতি থেকে প্রতিয়মান হচ্ছে যে, বাংলাদেশ একটি অনুন্নত রাষ্ট্র থেকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে যাচ্ছে। পাশাপাশি সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকলেও তা চাহিদার তুলনা একেবারে অপ্রতুল অবশ্যই নয়। তাহলে কেন সাধারন জনগণ দুর্যোগকালীন কিংবা চাহিদার সময় প্রয়োজনীয় নূন্যতম সহযোগিতাটুকু সেবাখাত কিংবা অর্থনৈতিক খাত থেকে পাচ্ছে না। অথচ বাংলাদেশ দ্রুত অর্থনৈতিকভাবে অগ্রগতির ধাবিত হওয়া দেশ গুলির মধ্যে অন্যতম। এই পরিস্থিতিতে আমরা কি বলতে পারি না, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পর্যাপ্ত সম্পদ না থাকলেও প্রয়োজনীয় সম্পদ রয়েছে কিন্তু অভাব রয়েছে সকল স্তরে ”জনগন বা ভোক্তার প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ পালন” করার। কেন আমরা স্বাধীনতার প্রায় পঞ্চাশ বছরের মধ্যে সরকারী-বেসরকারী-ব্যাংকিং সেক্টরে, ব্যবসায়ী সেক্টরে কর্মরত কর্মকর্তা, কর্মচারী সহ ব্যক্তি, সমাজ কিংবা রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে দায়িত্ব বোধ তৈরী করতে পারলাম না, জনগণের প্রতি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারলাম না?

আজকের করোনা ক্রান্তিকালে উপরোক্ত প্রশ্নগুলির উত্তর জানতে হলে সব কিছরু রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষণ হওয়া প্রয়োজন। দুর্যোগ মোকাবেলার অন্যতম নিয়ামক হচ্ছে সেই দেশ, এলাকা বা জনগোষ্ঠীর চলমান সক্ষমতা ও বিপাদপন্নতা নিরুপন । সঠিক বিশ্লেষণই পারে করোনা পরবর্তী ভবিষ্যত পরিকল্পনা, বিনিয়োগ এবং উন্নয়নে সঠিক নির্দেশনা প্রদান করতে। রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষনের জন্য প্রয়োজন হয় ইতিহাস ভিত্তিক আলোচনা। বাংলাদেশ ১৯৭১ সনের পূর্বে আমরা সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালী ছিলাম পাকিস্তানি উপনিবেশিক শাসন ও শোষনে নিষ্পেষিত। বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ ২৪ বছরের স্বাধীকার ও স্বাধীনতার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার লাল সূর্য খচিত সবুজ পতাকার নতুন রাষ্ট্র, বাংলাদেশ, বিশ্ব বাসীর স্বীকৃতি পেয়েছিলো। রাষ্ট্র নতুন হলেও এই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পৃথিবীর বড় শক্তিধর রাষ্ট্রগুলির ষড়যন্ত্র কোন সময়ে থেমে ছিলো না, কারন স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সমস্ত বাঙ্গালী জাতিকে একত্রিত করলেও এই সমাজের একটি বড় অংশ বাঙ্গালী জাতির স্বাধীকারের বিরুদ্ধে সব সময় শত্রু রাষ্ট্রর সাথে হাত মিলিয়েছে, রাজাকার তৈরী করেছে, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দালাল তৈরী করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, স্বাধীন রাষ্ট্রে রাজাকার বা পাকিস্তান পন্থী দালালদের কাজ কি? তারাতো পরাজিত শক্তি! কিন্তু পরাজিত শক্তি হলেও সেই শক্তির একটি রাজনীতি ছিলো, আদর্শ ছিলো যা আমাদের অনেকের নিকট গ্রহনযোগ্য না হলেও সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সেই রাজনীতির ধারক-বাহক ছিলো। সেই রাজনীতির বড় অস্ত্র ছিলো তীব্র ধর্মান্ধতা। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞগন বলে থাকেন, রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক আদর্শর কখনও মৃত্যু হয় না, সঠিক সুযোগ পেলে সেই রাজনীতির পুর্নজন্ম হয়। স্বাধীন রাষ্ট্রে যে রাজনীতির অবসান হওয়ার কথা ছিলো, সেই রাজনীতি কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও শেষ হলো না। বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের পিছনে যে রাজনৈতিক দর্শন কাজ করেছিলো তা হচ্ছে, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য, সম্পদের অসম বন্টন ব্যবস্থা, পাকিস্তানী ২২ পরিবারের লাগামহীন সম্পদ আহোরন ও তাদেও দুর্যোগের আমলাতন্ত্রের জনগনের নিকট জবাবদিহীতার অভাব, রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের পূর্ববাংলার জনগনের নিকট দায়বদ্ধহীনতা ইত্যাদি। স্বাধীন বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্র কাঠামো, রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি নিশ্চয়ই দরিদ্র ও সুযোগ বঞ্চিত মানুসের পক্ষে হওয়ার কথা ছিলো, লক্ষ হওয়া উচিত ছিলো জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার ও জবাবদিহিমুলক। অভিজ্ঞতা বলছে তা হয় নাই, মানুষ নিরাশ হয়েছে।, আমরা জানি সামষ্টিকভাবে ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গী থেকে সমাজ প্রভাবিত হয়, রাষ্ট্র কাঠামোর উত্তরন ঘটে, আইন তৈরী হয় ইত্যাদি। অন্যদিকে রাজনীতি আমাদের সমাজের ব্যক্তির সামাজিক, অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীর উম্মেষ ঘটায় তবে কোনটি আগে বা পরে তা বোঝা মুসকিল। ঠিক যেন ডিম আগে না মুরগী আগে ধাঁধার মতো।

দেশ স্বাধীন হলেও, নতুন দেশের জনগণ কিন্তু পাকিস্তান ও ব্রিটিশ উপনিবেশিক চরিত্র নিয়েই শুরু করে যেখানে ক্ষমতার দাম্ভিকতা, শ্রেষ্ঠত¦ প্রয়োগে একধরনের প্রতিযোগিতাহীন প্রতিদ্বন্দীতা থেকে তৈরী হয় নতুন বাঙ্গালী বেনিয়া’র ও মুষ্টিমেয় সুযোগ সন্ধানী ক্ষমতাকেন্দ্রিক গোষ্ঠীর। পাশাপাশি পরাজিত রাজনৈতিক শক্তিও ছিলো তৎপর, যা দৃশ্যমার হয়েছে চলমান বিভিন্ন রাজনৈতিক মঞ্চে আশ্রয় নিয়ে মৌলবাদী গোষ্ঠী তাদের আদর্শিক তৎপরতার মাধ্যমে। সেই কারনে স্বাধীনতার পর থেকেই ক্ষমতার অপপ্রয়োগ, দুর্নীতির আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং দিশাহীন রাজনৈতিক শক্তির উত্তরণ ঘটতে থাকে। আমরা যদি ১৯৭৫ সনের পূর্বাবর্তী রাজনৈতিক অবস্থার ময়নাতদন্ত করি তাহলে লক্ষ্য করবো, বঙ্গবন্ধু অনেক সীমাবদ্ধ সম্পদ ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে দেশকে পূর্নগঠনে মনোনিবেশ করেছিলেন এবং স্বল্প সময়ে আমাদের অর্থনীতি একটি শক্তিশালী কাঠামোর মধ্যে আসতে শুরু করে। কিন্তু তিনি এদেশের আমলা, সরকারী কর্মচারী, ডাক্তার, রাজনীতিবিদদের উদ্দেশ্যে বারবার জবাবদিহীতার কথা বলেছিলেন। কারন একটি দেশ শুধু সম্পদ দিয়ে পরিচালিত করা যায় না, প্রয়োজন হয় সম্পদের সর্ব্বোচ্চ ব্যবহার ও ফলাফল তৈরী করার জন্য দক্ষ নির্বাহী ও সেবা প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ, দায়বদ্ধ সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের; প্রয়োজন হয় সচেতন নাগরিক- যারা দিন শেষে সকলের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে। ’করোনা’ কালে ত্রাণ তছরুপ নতুন কিছু নয়, স্বাধীন হওয়ার পরপর অনেক রাজনৈতিক কর্মীকে দেখা গেছে রিলিফ চুরির বা তছরুপ করার জন্য রক্ষীবাহিনী দ্বারা শাস্তি ভোগ করতে, অসচেতন নাগরিকদেরও দেখা গেছে বিনা টিকিটে ট্রেন ভ্রমনের জন্য রেলওয়ে প্লাটফর্মে পুলিশের সামনে কান ধরে উঠা বসা করতে, অনেক পরিবারকে দেখা গেছে লুটের মালামাল ফেরত দিতে ইত্যাদি। অর্থাৎ দেশ স্বাধীন হলেও জনগণ বা সরকারের নির্বাহী কর্মী হিসেবে আমরা নবগঠিত রাষ্ট্রের কাছে দায়বদ্ধ হতে পারি নাই। আমাদের নির্বাহী কাঠামো, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান সমূহ একত্রিতভাবে দেশ ও জনগনের নিকট জবাবদিহিমূলক আচরণ প্রদর্শন করতে পারে নাই। রাজনৈতিক শক্তিগুলিও সম্পুর্ণ রূপে দেশ পুর্নাবসনের কাজে মনোনিবেশ করতে পারে নাই। এই সুযোগটি গ্রহন করেছিলো ১৯৭১ সনে পরাজিত শক্তি ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারী রাষ্ট্রসমুহ এবং তা চরমভাবে বাস্তবায়ন করেছিলো ১৯৭৫ সনে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্যে দিয়ে। পটপরিবর্তনের সাথে সাথেই সেই লুটপাটকারী গোষ্ঠী, জামাত, রাজাকার ও আলবদর রাজনৈতিক শক্তিগুলির জন্য তৈরী হয় এক নতুন অধ্যায়। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য সামরিক জান্তা যা করা দরকার, সেই ধরনের সামাজিক রীতিনীতি, দৃষ্টিভঙ্গী তৈরীতে বিনিয়োগ করে। একদিকে ধর্ম ভিত্তিক মৌলবার্দে প্রসার, অন্যদিকে জুয়া, মদ, ভ্যারাইটি শো’র নামে যুবসমাজকে নেশাগ্রস্ত করা, ব্যক্তিপুঁজির প্রসারে লুটপাট, দুনীর্তিকে প্রশয় দেয়া চলতে থাকে। এই স্বৈরাচারী ধারা কিন্তু ১৯৯১ সনের গণতন্ত্র পূর্নবাসন হওয়া অবধি চলতে থাকে এবং সেই সময় অবৈধভাবে সরকারী ক্ষমতা গ্রহনকারী শক্তি তাদের রাজনৈতিক শক্তির সমর্থন সৃষ্টি করার জন্য এগুলি পৃষ্ঠপোষকতা করতে থাকে।

১৯৯১ সনে সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহনের নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে দেশে গণতন্ত্র ফিরে এলেও দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলো এক অপরিপক্ক রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্লাটফর্ম। ১৯৭৫-১৯৯০ সন পর্যন্ত সুবিধাভোগী আমলা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী, ১৯৭১ সনের পরাজিত শক্তি ক্রমান্বয়ে নতুন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সাথে মিশে যেতে থাকে। আজকে গণতান্ত্রিক পরিবেশের ৩০ বছর, এর মধ্যেও গণতন্ত্র হোঁচট খেয়েছে। কারণ জনগণ হিসেবে আমরা গণতন্ত্রর আদর্শিক ব্যাখ্যা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছি বার বার। সমাজের সকল প্রতিষ্ঠানিক, অপ্রতিষ্ঠানিক পর্যায়ে কাঠামোগুলিতে নেতৃত্বের সুযোগ দিয়েছি যার অর্থ বিত্ত রয়েছে, পক্ষান্তরে সুযোগ দেইনি তাকে যার আদর্শিক নেতৃত্ব প্রদানের সক্ষমতা রয়েছে। বলা হয় জনগণের চিন্তা, কাজ ও সিদ্ধান্তর প্রতিফলন ঘটে নেতৃত্বর মাধ্যমে। নেতৃত্বর মধ্যে যখন সৃজনশীলতা, স্বচ্ছতা ও জনগণের সাথে সম্পৃক্ততা ও জবাবদিহিতার অভাব থাকে তখন তার প্রতিফলন পড়ে সরকারের নির্বাহী প্রতিষ্ঠানসমূহের কর্মকর্তাদের মধ্যেও এবং তাদেরও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতার অভাব পরিলক্ষিত হয়। সেই কারনে আজ যখন করোনাকালে জনগণনর টাকায় নির্মিত হাসপাতালে জনগনের চিকিৎসা হয় না, আমার নেতৃবৃন্দ চিকিৎসকদের কোন জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে পারছেন না। জনগণের টাকায় দরিদ্র জনগণের অধিকার ত্রাণ সহায়তা যখন নির্বাচিত প্রতিনিধি তছরুপ করছে, তখন রাজনৈতিক শক্তিগুলি তা প্রতিরোধে দৃষ্টান্তমুলক ব্যবস্থা গ্রহন করতে পারছেন না। দেশের বাৎসরিক বাজেটের শতকরা ২৫ ভাগ অর্থ যখন দেশের ২০ ভাগ দরিদ্র মানুষের উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয় করা হচ্ছে তখন সেই সহায়তা পেতেও প্রয়োজন হচ্ছে উৎকোচের যা এখন প্রায় ’ওপেন সিক্রেট’ বিষয়। তাহলে বলতে হয়, বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ যেমনবলেছিলেন, ’তোমরা সৎ হও, আদর্শবান হও’; আজ ৪৮ বছর পওে ২০২০ সনে এসেও আমাদের বলতে হচ্ছে ’তোমরা সৎ হও, আদর্শবান হও’। অথচ ১৯৭২ সনের বাংলাদেশ ও ২০২০ সনের বাংলাদেশ অবশ্যই এক নয়। আজকের বাংলাদেশ মহাকাশে স্যাটলাইট পাঠাচ্ছে, আনবিক শক্তির বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরী করছে, উন্নত বিশে^র ন্যায় জনযোগাযোগ উন্নয়নে অনেক পদক্ষেপ গ্রহন করছে, পৃথিবী অন্যতম বড় রেল ও সড়ক সমন্বিত পদ্মা সেতু নিজ অর্থায়নে তৈরী করছে। ওয়ার্ল্ড আলট্রা ওয়েলথ প্রতিবেদন ২০১৮ অনুসারে বাংলাদেশের ধনকুবেরদের সামগ্রিক সম্পদেও বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ যা পৃথিবীর সর্ব্বচো কিন্তু এই করোনাকালে ব্যক্তি পর্যায়ের সহযোগিতার উদ্যোগ সেই ভাবে পরিলক্ষিত হয় নাই। উপরোক্ত বিশ্লেষণ ও বর্তমান কোভিড ১৯ এর ক্রান্তিকাল থেকে প্রতিয়মান হয় যে, আজকের বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে দৈন্য নয়। আমাদের দৈন্যতা হচ্ছে জবাবদিহিমুলক শাসন ব্যবস্থা, সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান সমুহের গণমুখী জবাবদিহীতার অভাব, জনগনের পক্ষে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টি না থাকা, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় জনসম্পৃক্ততা না থাকা এবং দেশের প্রতি সঠিক আনুগত্য রয়েছে এমন সচেতন নাগরিক তৈরী করতে রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যর্থতা। সব মিলিয়ে বলা যায় আমাদের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের চেয়ে সবক্ষেত্রে দায়িত্ববোধের অভাব প্রকট রয়েছে যার উত্তরণ ছাড়া কোন উন্নয়ন টেকসহ হবে না।