ওগো কর্ণধার তোমায় করি নমস্কার

85
Social Share
  • অজয় দাশগুপ্ত:

শেখ হাসিনা স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করতে না পারলে কি হতো তা ভাবলেও শিউরে উঠি। তখনকার সময়ে আমরা যুবক হিসেবে রাজপথে থেকেছি। আমাদের অজানা না কি হয়েছিল আর কি হতে পারত। বাংলাদেশ যে একটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক রাষ্ট্র সে কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম আমরা। জেনারেল জিয়াউর রহমানের কৌশল ও চাতুরী আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার চক্রান্ত শেষ না হতেই দেশ শাসনে এসেছিলেন সামরিক জেনারেল এরশাদ। প্রয়াত এই জেনারেল ছিলেন ধুরন্ধর। তার আমলের আগেও আওয়ামী লীগ ছিল বটে, তবে তা খাতা কলমে। নত মস্তকে স্বীকার করি সেসব নেতার অবদান যাঁরা দুঃসময়ে আওয়ামী লীগের হাল ধরে ছিলেন। তাঁরা না থাকলে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন কখন কিভাবে হতো বলা মুশকিল। কিন্তু তাঁদের সাধ্য ছিল না আওয়ামী লীগের ভাঙ্গন রোধ করার ক্ষমতা। আওয়ামী লীগ বাকশাল, মিজানুর রহমান চৌধুরী ও দেওয়ান ফরিদ গাজীর আওয়ামী লীগ মিলে অনেক ধারা তখন। সে ধারাগুলো নদী যেমন সাগরে মিশে তেমনি বিলীন হয়ে গেল আওয়ামী লীগে। কোন্ আওয়ামী লীগে? শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগে। শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ যে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ এবং তাঁর কন্যার হাতে নিরাপদ এটা বোঝার পরপরই মানুষ মনপ্রাণ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল সে দলের পেছনে। একদিকে তখন বিএনপি ও তখনকার মুসলিম লীগার আর রাজাকারদের দৌরাত্ম্য, আরেক দিকে এরশাদের কূটকৌশল। সে সময় আওয়ামী লীগ ও প্রগতিশীলদের শোচনীয় বাস্তবতায় ফিরলেন নেত্রী শেখ হাসিনা। কেমন ছিল সেদিন?

রাজনীতির মতোই প্রকৃতিও সেদিন ছিল ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ। ১৯৮১ সালের এই দিনটি ছিল রবিবার। ছিল কালবৈশাখীর হাওয়া, বেগ ছিল ঘণ্টায় ৬৫ মাইল। প্রচ- ঝড়-বৃষ্টি আর দুর্যোগও সেদিন গতিরোধ করতে পারেনি গণতন্ত্রকামী লাখ লাখ মানুষের মিছিল। গ্রাম-গঞ্জ-শহর-নগর-বন্দর থেকে অধিকারবঞ্চিত মুক্তিপাগল জনতা ছুটে এসেছিল রাজধানী ঢাকায়, তাদের একমাত্র আশার প্রদীপ বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরাধিকারী শেখ হাসিনাকে বরণ করতে। মুষলধারার বৃষ্টি-বাদল উপেক্ষা করে তারা বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিল ‘নেত্রী’ কখন আসবেন এই প্রতীক্ষায়। অবশেষে বিকেল চারটায় কুর্মিটোলা বিমানবন্দর দিয়ে জনসমুদ্রের জোয়ারে এসে পৌঁছান শেখ হাসিনা। দীর্ঘ সাড়ে ছয় বছর পর দেশের মাটিতে পা রাখেন তিনি। তাঁকে এক নজর দেখার জন্য কুর্মিটোলা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শেরেবাংলা নগর পর্যন্ত রাস্তাগুলো রূপ নিয়েছিল জনসমুদ্রে। পর্যায়ক্রমে দেশ শাসনে আসা আওয়ামী লীগের পেছনে তাঁর অবদান পাহাড়ের মতো অটল। তিনি না ফিরলে এদেশে স্বাধীনতার ঘাতক-দালালদের বিচার ও শাস্তি ছিল দিবাস্বপ্নের মতো। জাহানারা ইমামের গণআদালতের ধারাবাহিকতায় শাহবাগের জন্ম হলেও সে কাজ ছিল কঠিন। শেখ হাসিনা আমেরিকার জন কেরির ফোন তুচ্ছ করে নানা দেশের নেতাদের অন্যায় অনুরোধ পাত্তা না দিয়ে পাকিস্তানের ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত ব্যর্থ করে এ দেশ ও ইতিহাসকে কলঙ্কমুক্ত করেছেন। জাতির পিতার হত্যা ও ১৫ আগস্টের বিভীষিকাময় কলঙ্কের বিচার করে মুক্তি দিয়েছেন আমাদের। দেশ ও জাতির বুকের ওপর বসে থাকা সেসব পাথর আর কেউ সরাতে পারত না।

শেখ হাসিনার শাসনভার গ্রহণ কোন সহজ কাজ ছিল না। আমাদের সমাজে একশ্রেণীর মানুষ এখনও পাকিস্তানের স্বপ্নে বিভোর। এরা সংখ্যায় যাই হোক ষড়যন্ত্রে পটু। তাদের ছিল টাকা, মধ্যপ্রাচ্যের লবিং, ছিল পাকিস্তানের মদদ। আজও সে চক্রান্ত চলমান। সম্প্রতি আল জাজিরার অপপ্রচারে মূলত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধাচারণ ছিল আসল বিষয়। এ ঘটনা প্রমাণ করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও ইতিহাসবিরোধী শক্তি কতটা ভয়ানক। শেখ হাসিনার শক্তি, দেশ শাসনে পোক্ত হওয়ার পরও এরা বেপরোয়া। বলাবাহুল্য, বিলেতে এক ঘাঁটি আছে যেখান থেকে শেখ হাসিনা ও প্রগতিবিরোধী অভিযান আর ষড়যন্ত্র চালানো হয় । সে ঘাঁটি সবার জানা। বিএনপি জনগণের ভেতর এখনও তার কিছু প্রভাব টিকিয়ে রেখেছে। সরকারের দুর্বলতা আর নানাবিধ কেলেঙ্কারি আর্থিক ও সামাজিক অপঘটনায় তাদের জন্য সহানুভূতি জাগলেও মানুষ বুঝতে পারে তারা পারবে না। কারণ তাদের সে ধরনের সাংগঠনিক শক্তি নেই। তারা তাদের শীর্ষ নেতা একাধিকবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকেই কারামুক্ত করতে পারেনি। পারেনি দেশব্যাপী কোন আন্দোলন বা জনমত গড়ে তুলতে। এদের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতার কারণ কিন্তু দুর্বল নেতৃত্ব। সে জায়গায় নিজেদের ঘর ঠিক না করে তারা ভর করে আছে বিলেতের ওপর। সে ভরসার আরেক নাম ভুল। শেখ হাসিনাকে গ্রেনেড হামলায় হত্যা করতে ব্যর্থ সে অপরাজনীতি আজও তাঁর পেছনে লেগে আছে। তারা জানে তিনি যতদিন ক্ষমতায় থাকবেন ততদিনই নিরাপদ থাকবে বাংলাদেশ।

এ কথা বলি না তাঁর সরকারের আমলে সমাজে সাম্য বা ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বরং এমন এমন সব কেলেঙ্কারি আর আর্থিক দুর্নীতির খবর আসে যাতে মানুষ বিরক্ত হয়ে পড়ে। তাদের মনে হাজারও প্রশ্ন- লুটপাট, রিজার্ভ উধাওসহ আর্থিক কেলেঙ্কারির কোন জবাব মেলেনি এখনও। উত্তর মেলেনি হত্যাকা-গুলোর। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে সবাই জানেন শেখ হাসিনা আছেন বলেই সমাজ এখনও সচল। দেশ নিরাপদ। তিনি না থাকলে এদেশের প্রগতিশীলতা মূলত এতিম। এই নির্ভরতা একদিকে যেমন জাতিকে নির্ভার রেখেছে, অন্যদিকে আছে ভয়। তাঁকে আমরা দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় চাই। সঙ্গে এটাও চাই তিনি থাকতে থাকতেই যেন দেশ পেয়ে যায় বিকল্প নির্ভরতার কোন জায়গা।

তাঁর শাসন আমলের চতুর্থবারে তিনি অনেক বেশি পরিণত। তাঁর নেতৃত্বহীন দেশ ও সরকার ভাবাও অসম্ভব। তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সুফলে আজ উন্নয়নের রথে বাংলাদেশ। এমনকি কঠিন করোনায়ও বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। এখন তাঁর কাছে প্রত্যাশা আগামী নেতৃত্ব, যা তাঁর প্রত্যাবর্তনের পর পাওয়া আশা ও সম্ভাবনাকে আরও ফলবতী করবে। আমরা তাঁর কাছে এটাই আশা করি জনগণের প্রত্যাশা গণতন্ত্র ও সামাজিক সাম্য আর অসাম্প্রদায়িকতার এক সুবর্ণ স্বদেশ। শেখ হাসিনা দেশ ছাপিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আজ সমাদৃত। এক সময় আমাদের নেতারা যে কোন সম্মেলন বা আন্তর্জাতিক ফোরামে ছিলেন দ্বাদশতম খেলোয়াড়। সবার সঙ্গে ফ্রেমবন্দী ছবিতে দাঁড়িয়ে থাকার বাইরে আর কোন কাজ ছিল না তাদের। শেখ হাসিনা সে দৃশ্য পাল্টে দিয়েছেন। তাঁকে জার্মানির চ্যান্সেলর থেকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট, চীনের প্রধানমন্ত্রী হয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী সবাই গুরুত্ব দেন। দিতে বাধ্য হন। কারণ তিনি দেশ ও দেশের ইমেজ নিয়ে গেছেন সে পর্যায়ে। তবু একদল মানুষ তা পছন্দ করে না। দেশে, দেশের বাইরে সমানে ষড়যন্ত্র করছে তারা। কোন লাভ হয়নি। আশা করি ভবিষ্যতেও তাদের ষড়যন্ত্র কোন কাজে আসবে না। বাংলা বাঙালীর মনের মানুষ শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা। তাঁর কাছেই নিরাপদ স্বদেশ ও বাঙালীর ভবিষ্যত।

সিডনি থেকে

[email protected]