এবার গোটা পরিবারকে পুড়িয়ে মারার হুমকি

ফেনীর সোনাগাজীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে মারার মামলার অভিযোগ গঠনের দিন আসামিরা এজলাস ও আদালত চত্বরে তার বড় ভাই মাহমুদুুল হাসান নোমানের দিকে তেড়ে গিয়েছিলেন। মুক্তি পাওয়ার পর তাঁরা দেখে নেবেন বলে হুমকিও দিয়েছিলেন। নোমান এই মামলার বাদী। গত বৃহস্পতিবার ফাঁসির রায় শোনার পর আদালতের ভেতরেই আসামিরা নুসরাতের মতো তার পরিবারের সবাইকে পুড়িয়ে মারার হুমকি দেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ কারণে পরিবারটি বিচলিত।

তবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক আশ্বস্ত করে বলেছেন, যত দিন দরকার নিরাপত্তা পাবে নুসরাতের পরিবার।

গত বৃহস্পতিবার নুসরাত হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মামুনুর রশিদ। মামলার ১৬ আসামির সবাইকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন তিনি।

রায় ঘোষণার পর নুসরাতের পরিবার নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে।

নুসরাতের ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান সাংবাদিকদের বলেন, ‘রায় ঘোষণার কিছুক্ষণ পর এজলাসে দাঁড়িয়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শাহাদাত হোসেন শামীম ও হাফেজ আব্দুল কাদের আমাকে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দেয়। তারা বলে, আমাদের পরিণতিও নুসরাতের মতো হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা এই ভেবে বিচলিত যে ফাঁসির দণ্ড নিয়ে এ আসামিরা যে দুঃসাহস দেখিয়েছে, সেটা নজিরবিহীন।’

গতকাল শুক্রবার নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বলেন, ‘মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে মোবাইল ফোনে ও লোক মারফত আসামিদের স্বজনরা আমার পরিবারের সদস্যদের হুকমি-ধমকি দিয়ে আসছে।’

নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুুল হাসান নোমান বলেন, মামলার অভিযোগ গঠনের দিন আসামিরা একবার তাঁকে হুমকি দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার রায় হওয়ার পরও আদালতের ভেতরেই ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা সবার সামনে তাঁকে হুমকি দেন এবং গালাগাল করেন। তিনি আরো বলেন, ‘আমরা আগেও হুমকি পেয়েছি, এবার আদালতে বসে তারা হুমকি দিল। আমরা আতঙ্কে আছি। কারণ তারা প্রভাবশালী এবং তাদের অনেক অনুসারী ও আত্মীয়-স্বজন আছে।’

আদালতের ভেতরে হত্যার হুমকি পাওয়ার বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়েছে জানিয়ে নোমান বলেন, ‘আমাদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ আসামিদের ফাঁসির রায় হলেও তাদের লোকজন তো বাইরে আছে।’

তবে নোমান বলেন, ‘গত ১০ এপ্রিল থেকে আমাদের বাড়িতে সার্বক্ষণিক পুলিশের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে জেলা পুলিশ প্রশাসন। রায় ঘোষণার দিনে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরো বাড়ানো হয়েছে। আমি ফেনীর পুলিশ সুপার সাহেবকে ধন্যবাদ জানাই যে তিনি সব সময় আমাদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন।’

আসামিদের আইনজীবী আহসান কবির বেঙ্গল বলেন, ‘ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হয়তো প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, আমি তাদের হুমকি দিতে দেখিনি।’

সোনাগাজী মডেল থানার ওসি মো. মঈন উদ্দিন আহামেদ বলেন, ‘আমরা নুসরাতের বাড়ির সকল সদস্যের নিরাপত্তার বিষয়টির গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে সার্বক্ষণিক পুলিশ মোতায়েন রেখেছি এবং মামলার রায় ঘোষণার আগের দিন থেকে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরো জোরদার করেছি। তার পরও আমরা নুসরাতের পরিবারের সদস্যদের সাথে নিয়মিত কথা বলছি ও তাদের আশ্বস্ত করছি নিরাপত্তার বিষয়ে।’

ফেনীর পুলিশ সুপার খোন্দকার নুরনবী বলেন, ‘আমি প্রতিদিন নুসরাতের পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার বিষয়ে খোঁজখবর রাখছি। ইনশাআল্লাহ আমি আবারও আপনাদের মাধ্যমে নুসরাতের পরিবারের সকল সদস্যের আশ্বস্ত করছি, বিন্দুমাত্র তাদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে না। ইতিমধ্যে আমরা নিরাপত্তাব্যবস্থা দ্বিগুণ জোরদার করেছি। প্রয়োজনে আমরা সাদা পোশাকে নিরাপত্তা জোরদার করব।’

উল্লেখ্য, গত ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাকে। পরে ৬ এপ্রিল ওই মাদরাসা কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে গেলে নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন সিরাজের অনুসারীরা। হত্যাকারী ও তাঁদের সহযোগীরা ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে প্রচার চালিয়ে ব্যর্থ হন। ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নুসরাতের মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় করা মামলা তদন্ত শেষে গত ২৯ মে ১৬ আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গত ২০ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। গতকাল মামলার রায় ঘোষণা করা হয়, যাতে নুসরাতকে হত্যার হুকুমদাতা অধ্যক্ষ (বরখাস্তকৃত) সিরাজ ও হত্যাকাণ্ডে নানা ভূমিকায় থাকা ১৬ আসামির সবার ফাঁসির আদেশ হয়েছে।

এলাকাবাসীর সন্তোষ : রায়ের পর এলাকার সাধারণ মানুষ সন্তোষ প্রকাশ করেছে। এলাকাবাসী মনে করছে, এই রায়ের মাধ্যমে ন্যায় বিচারের প্রতিফলন ঘটেছে। খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা হওয়ায় আর কেউ কোনো নারীর ওপর নির্যাতন করতে সাহস করবে না।

সোনাগাজী উপজেলার মহেশ্চর গ্রামের মোশারফ হোসেন বলেন, ‘নুসরাত একজন প্রতিবাদী ছাত্রী ছিল। রায়ের মাধ্যমে নুসরাতের আত্মা শান্তি পাবে। আমরা এই রায়ে খুশি।’

সোনাগাজী বাজারের ব্যবসায়ী ইমাম হোসেন বলেন, ‘এ রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো কেউ কোনো নারীর ওপর নির্যাতন করে পার পেতে পারে না। নুসরাত সব সময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করত। আমরা খুনিদের ফাঁসির রায় কার্যকর দেখতে চাই।’

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল হালিম বলেন, ‘এই রায় প্রমাণ করে অপরাধী যত বড় শক্তিশালী হোক না কেন শেখ হাসিনা সরকারের আমলে অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই।’

বাখরিয়া গ্রামের জাবেদ হোসেন বলেন, ‘উচ্চ আদালতেও যেন এই রায় বহাল থাকে।’