একজন সাহসী শিল্পীযোদ্ধার শুভ জন্মদিনে

Social Share

আজ (২৩ সেপ্টেম্বর) আমার অনুজ প্রতিম বন্ধু এবং দেশের একজন জনপ্রিয় সংস্কৃতিসেবীর জন্মদিন। তিনি সত্তর বছর পার হলেন। দেশে তো আরও অনেক সংস্কৃতিসেবী আছেন, তাদের জন্মদিনে কিছু না লিখে এই বিশেষ সংস্কৃতিসেবীর জন্য লিখতে আগ্রহী হলাম কেন এই প্রশ্নটি কেউ কেউ করতে পারেন। এক্ষেত্রে আমার জবাব, দেশের একটি দুর্যোগময় মুহূর্তে এই শিল্পী বা সংস্কৃতিসেবীর সঙ্গে আমার বিশেষ সম্পর্ক এবং বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি অকৃত্রিম ও অকুতোভয় নিষ্ঠাই তার সম্পর্কে আজ আমাকে কিছু লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

মানুষটির নাম পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়। একজন অভিনেতা, আবৃত্তিকার, নাট্যকার, সংগঠক এবং মুক্ত চিন্তার রাজনৈতিক কলামিস্ট। অভিনয়ে তিনি যেমন পারদর্শিতা দেখিয়েছেন, তেমনই পারদর্শিতা দেখিয়েছেন সংবাদপত্র সম্পাদনাতেও। ১৯৫০ সালে ফরিদপুর শহরে তার জন্ম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার ডিগ্রীধারী। আমার মতে, তার অভিনেতা পরিচয়টাই বড়। গত শতকের আশির দশকের শুরুতে টিভি সিরিয়াল ‘সকাল সন্ধ্যায়’ শাহেদ চরিত্রে অভিনয় করে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তারপর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ‘একাত্তরের যীশু’, ‘আগামী’ ইত্যাদি ছবিতে অভিনয় করে দর্শকমন জয় করেন। কর্মজীবনে দৈনিক লালসবুজ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক, এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে চাকরি করেছেন।

বাংলাদেশে নবনাট্যধারা এবং বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র প্রবর্তনেও তিনি একজন অগ্রপথিক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের যুব সংগঠক ছাড়াও স্বাধীনতা পরবর্তীকালে শেখ হাসিনার নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জনমত গঠনে তিনি সফল সংগঠকের ভূমিকা পালন করেছেন। বঙ্গবন্ধু যে জেলার সন্তান, সে জেলাতেই জন্ম পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের। বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির আদর্শ তিনি তার পেশাগত জীবনেরও সকল ক্ষেত্রে বহন করে চলেছেন।

যা হোক, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন বৃত্তান্ত বর্ণনা আমার আজকের এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আমার উদ্দেশ্য, দেশের এক দুর্যোগময় মুহূর্তে, ক্ষমতায় যখন বিএনপি-জামায়াত আসীন, তখন বিদেশে বসে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-ের ওপর চলচ্চিত্র নির্মাণের যে দুঃসাহসিক উদ্যোগ আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে ‘শেখ মুজিব রিসার্চ সেন্টারের’ ব্যানারে নিয়েছিলাম, তাতে পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অকুতোভয় ভূমিকার কথা বলা। এই ছবিতে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকায় অসাধারণ অভিনয় করে, শচীন সেনগুপ্তের সিরাজউদ্দৌল্লা নাটকে সিরাজউদ্দৌল্লার ভূমিকায় অভিনয় করে নির্মলেন্দু লাহিড়ী তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার ‘কুলীন’ বুদ্ধিজীবী মহলেও যে অভিনন্দন ও স্বীকৃতি পেয়েছিলেন, কিন্তু পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় বর্তমান বাংলাদেশের আঁতেল বুদ্ধিজীবী মহলে তা পাননি। তার কারণ, ঢাকার এই আঁতেলদের ঈর্ষা ও সঙ্কীর্ণতা। সে কথায় যথাসময়ে আসব। তবে আঁতেলদের কাছে সমাদর না পেলেও শুধু বাংলাদেশের নয়, সারা বিশ্বের বাঙালী দর্শকের কাছে পীযূষ বঙ্গবন্ধুর চরিত্রে অভিনয় করে বিপুল প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছেন।

আমি দীর্ঘকাল ধরে লন্ডনে আছি। তাই আশির দশকে যারা বাংলাদেশে শিল্পী, সাহিত্যিক, নাট্যশিল্পী, চলচ্চিত্র শিল্পী, নাটক ও চিত্র পরিচালক হিসেবে তাদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন, তাদের অনেকের নাম ও কাজের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না। কিন্তু ‘একাত্তরের যীশু’ ছবিটির বদৌলতে পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয় প্রতিভার সঙ্গে পরিচিত হই। তার আগে ‘দৈনিক লালসবুজ’ পত্রিকায় তাকে পেয়েছিলাম নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে। পরে বুঝতে পেয়েছিলাম তার প্রতিভা বহুমুখী।

সম্ভবত নব্বইয়ের দশকে নিউ ইয়র্কে গিয়েছিলাম বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কিত এক সম্মেলনে। বাংলাদেশ থেকে প্রয়াত নাট্যকার মমতাজ উদ্দীনসহ অনেক শিল্পী, সাহিত্যিক সম্মেলনে গিয়েছিলেন। পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ও গিয়েছিলেন। যতদূর মনে পড়ে, মুক্তিযুদ্ধে সম্পর্কিত একটি নাটকে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে সকলের মন কেড়েছিলেন। তারপর পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার কোন যোগাযোগ ছিল না।

দু’হাজার সালের গোড়ায় লন্ডনে শেখ মুজিব রিসার্চ সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয়। আমি সেন্টারের সভাপতি নির্বাচিত হই। এ সময় আমার চিন্তাভাবনায় আসে বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকা-ের ওপর একটি নাটক লেখার। তখন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী এবং এই হত্যাকা-ের সমর্থক বিএনপি-জামায়াতের রাজত্ব চলছে। দেশে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণও বিপজ্জনক। ঠিক করলাম বিদেশেই নাটকটি মঞ্চস্থ করতে হবে।

আমি নাটকটি লেখার ভার নিলাম। মডেল করলাম শচীন সেনের জনপ্রিয় ‘সিরাজউদ্দৌল্লা’ নাটকটি। এই নাটকটি আঁতেলদের প্রিয়, এবস্ট্রাক্ট আর্ট-ড্রামা নয়। শহরের সাহেব ও বাবু থেকে গ্রামের চাষাভূষা বুঝতে পারে এমন একটি নাটক। এই নাটকটিই সিরাজউদ্দৌল্লাকে বাঙালীর কাছে শহীদ জাতীয় বীর হিসেবে প্রতিষ্ঠা দান করে। আমিও ইচ্ছে করেছিলাম, বঙ্গবন্ধুকে সর্বস্তরের জনগণের হৃদয়ে পৌঁছে দেয়া এবং তার হত্যা চক্রান্তের নায়কদের মুখোশ উন্মোচন করা যায় এমন নাটক লিখব। আঁতেলদের প্রিয় নান্দনিক নাটক লিখব না। নান্দনিক নাটক নন্দন সন্তানেরাই লিখুন এবং তারাই দেখুন।

নাটকের দু’তিনটি পর্ব লেখার পরই আর এগুতে পারি না। আমার নিজের সময়ের অভাব এবং তথ্যসংগ্রহে নানা অসুবিধা। ঢাকা থেকে কেউ সরকারের ভয়ে সহযোগিতা করতে চায় না। আমি নাট্যকার নই। নাটক লেখায় অভিজ্ঞতার অভাব। তাই নাটকের ওই দুই এক পর্ব লিখেই ঠিক করলাম, আর লিখব না। এই সময় নাটকটি শেষ করার জন্য আমাকে যারা প্রবলভাবে উৎসাহিত করেছেন তারা হলেন লন্ডনের বাঙালী মহলে অত্যন্ত পরিচিত দুই মহিলা সংস্কৃতিসেবী পারভিন সুলতানা এবং ঊর্মি মাজহার। তথ্যাদি সংগ্রহে সাহায্য করেছেন ব্যারিস্টার শামসুদ্দীন চৌধুরী মানিক (পরবর্তীকালে বিচারপতি)।

নাটক তো লেখা হলো। এখন এর মার্জনা পরিমার্জনা কে করবেন? আমি তো একজন অভিজ্ঞ নাট্যকার নই। নাটকের পা-ুলিপি খুব গোপনে পাঠালাম আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং দেশে বিপুলভাবে জনপ্রিয় এক নাট্যশিল্পীর কাছে। তিনি প্রগতিশীল সংস্কৃতিসেবী হিসেবে পরিচিত। তিনি পা-ুলিপি তো দেখলেনই না, আমার টেলিফোনের জবাবে বললেন, ‘গাফফার ভাই, আমি তো পারফরমার, নাট্যকার নই। এটা আমি দেখে দিতে পারবো না।’ প্রথমেই একটা ধাক্কা খেলাম। নিজের মতো করেই নাটকটা সংশোধন করে নিলাম।

এই বিপদের সময় আমাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন হাসান ইমাম-লায়লা হাসান দম্পতি। দু’জনই বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনে দুটি উজ্জ্বল নাম। প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনেরও পুরোধা। তাদের ডাকা মাত্র লন্ডনে চলে এলেন। আমাকে বললেন, আপনি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ছবি করবেন, আর আমি আসব না? তাতে বিএনপি সরকারের কাছ থেকে যতো বিপদ আসে, আসুক।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-ের ওপর রচিত নাটক ‘পলাশী থেকে ধানমণ্ডি’ লন্ডনে মঞ্চস্থ করার ব্যাপারে কি সব সমস্যা, হুমকি মোকাবেলা করতে হয়েছে, সেই দীর্ঘ কাহিনীতে আর যাব না। সবশেষে সমস্যা দাঁড়াল বঙ্গবন্ধুর ভূমিকায় কে অভিনয় করবেন? ঢাকার প্রগতিশীল শিল্পী গোষ্ঠীর দু’জন প্রধান অভিনেতাকে চিঠি লিখে কোন জবাবই পেলাম না। শুনলাম, তারা বিএনপির মোসাদ্দেক আলী ফালুর সঙ্গে চুটিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য করছেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তাদের গ্রুপের একজন আবার মন্ত্রীও হয়েছেন।

বঙ্গবন্ধুর ভূমিকায় অভিনয় করার জন্য যখন অভিনেতা খুঁজে পাচ্ছিলাম না, তখন হাসান ইমাম (তিনি তখন নাটকটির রিহার্সাল দিচ্ছিলেন) বললেন, পীযুষ বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রস্তাব দিলে কেমন হয়? আমি বললাম, তিনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোক। মুসলমান অভিনেতারাই যেখানে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকায় অভিনয়ে রাজি নন, তখন তিনি কি রাজি হবেন? আর তাকে কোথায় পাব? তার ঢাকার ঠিকানা তো জানি না। হাসান ইমাম বললেন, পীযূষ অন্যদের মতো সুবিধাবাদী নন। সাহসী অভিনেতা। তিনি রাজি হতে পারেন।

ঢাকায় অনেককেই টেলিফোন করে পীযূষের খোঁজ জানতে চাইলাম। তারা কেউ খোঁজ জানলেও না জানার ভান করলেন। শেষ পর্যন্ত তারানা হালিম জানালেন, ‘গাফ্ফার ভাই, আমি পীযূষকে বঙ্গবন্ধুর চরিত্রে অভিনয়ের জন্য লন্ডনে যেতে রাজি করাব।’ আমাদের সমস্যা দূর হলো। তারপর এক শুভ সন্ধ্যায় পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় লন্ডনে এসে পৌঁছলেন। বিএনপির ভাড়াটে গু-ারা থিয়েটার হলে হামলা চালাবার হুমকি দিয়েছিল। তাতে সফল হয়নি। হাজার দর্শক ভর্তি হলে পীযূষ বঙ্গবন্ধুর ভূমিকায় অনবদ্য অভিনয় করে নাটকের শেষ অঙ্কে সকলকে কাঁদিয়েছেন।

লন্ডনে ‘পলাশী থেকে ধানমণ্ডি’ নাটকের সফল মঞ্চায়নের পর নিউ ইয়র্কেও নাটকটির মঞ্চায়ন হয়। সেখানেও বিএনপি ও জামায়াতের লোকেরা হল ঘেরাও করেছিল হামলা চালানোর জন্য। পুলিশের তৎপরতায় পারেনি। নিউ ইয়র্কেও হল ছিল দর্শক ভর্তি।

নাটকটিকে যখন ছবিতে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেই, তখনো শুধু বঙ্গবন্ধুর চরিত্রে অভিনয় করে নয়, কলকাতার অরোয়া স্টুডিওতে তার শূটিংয়ের ব্যবস্থা করাসহ নানা চরিত্রে অভিনেতা/অভিনেত্রী সংগ্রহ ইত্যাদি সকল কাজে সাহায্য করেছেন পীযূষ। তার প্রাণনাশের হুমকি এসেছে কয়েকবার। তিনি তা আগ্রহ করেছেন। তার কাছে আমি ঋণী। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নাটক ও ছবি করার সময় তিনি সাহসী হয়ে এগিয়ে না এলে এই নাটক ও ছবি করা হয়তো আমার পক্ষে সম্ভব হতো না।

দেশ যখন দুঃশাসনের কবলে তখন জীবন বিপন্ন করে বঙ্গবন্ধুর চরিত্রে অভিনয় করে পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় পুরস্কৃত হননি। আমাদের আঁতেল শিল্পী গোষ্ঠীর কাছে উপেক্ষিত হয়েছেন। তারা নানাভাবে চেয়েছেন ছবিটির নানা খুঁত ধরতে এবং এটি যে একটি মানসম্মত ছবি হয়নি তা প্রমাণ করতে। তাদের চেষ্টা সফল হয়নি। ছবিটি সারা বিশ্বে দেখানো হয়েছে। বাংলাদেশের ঘরে ঘরে সমাদৃত হয়েছে। আঁতেল শিল্পীরা ঈর্ষায় মরেছেন। কিন্তু নিজেরা বঙ্গবন্ধুর ওপর একটি ছবি তৈরি করতে পারেননি, অথবা চাননি। তাদের উদ্দেশে আমার বলার কথা-‘বরং নিজেই তুমি লেখ না’ক একটি কবিতা/ বলিলাম ম্লান হেসে/ছায়াপি- দিল না উত্তর।’

পীযূষ শুধু অভিনয় জগতে নয়, আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনেরও এক সাহসী ব্যক্তিত্ব। সম্প্রতি দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বৃদ্ধির লক্ষ্যে গড়ে তুলেছেন ‘সম্প্রীতি বাংলাদেশ’ নামে একটি সংগঠন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে নিবেদিত এই সাহসী শিল্পী আরও নানা কর্মকা-ে নিয়োজিত। তার যোগ্য সহধর্মিণী জয়া। আজকের শুভ জন্মদিনে দুজনকেই আমি শুভেচ্ছা জানাই, দীর্ঘজীবন কামনা করি।