ই-পাসপোর্ট যুগে আজ থেকে বাংলাদেশ

Social Share

ইন্দোনেশিয়ায় একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমাইয়া বিনতে আবদুস সালাম। তাই জরুরি ভিত্তিতে তাঁর পাসপোর্ট দরকার। গত ১ ডিসেম্বর পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছিলেন তিনি। কিন্তু গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত পাসপোর্ট মেলেনি। অন্যদিকে চীনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপের জন্য আবেদনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আনিকা ইসলাম। সাত দিনে পাসপোর্ট পেতে তিনি আবেদন করেছিলেন গত ২৪ ডিসেম্বর। নানামুখী চেষ্টায় অবশেষে গতকাল পাসপোর্ট হাতে পেয়ে তাঁর অভিব্যক্তি ছিল সোনার হরিণ হাতে পাওয়ার মতো। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পাসপোর্ট অফিসে গতকাল সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত অবস্থান করে এসব তথ্য মিলেছে। পাসপোর্ট পেতে দিনভর অসংখ্য আবেদনকারী সেখানে গিয়ে দৌড়ঝাঁপ করেন। তবে পাচ্ছেন খুব কমসংখ্যক গ্রাহক। সময়মতো পাসপোর্ট না পেয়ে অনেককেই হা-পিত্যেশ করতে দেখা যায়।  এমন বাস্তবতায় আজ বুধবার ইলেকট্রনিক পাসপোর্ট (ই-পাসপোর্ট)

উদ্বোধন করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এদিন থেকেই ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে পারবেন সবাই। প্রাথমিক পর্যায়ে রাজধানীর আগারগাঁও, যাত্রাবাড়ী ও উত্তরা পাসপোর্ট অফিসে এই কার্যক্রম চলবে। পর্যায়ক্রমে দেশের সব কেন্দ্র থেকেই ই-পাসপোর্ট সরবরাহ করা হবে।

ইলেকট্রনিক পাসপোর্ট (সংক্ষেপে ই-পাসপোর্ট) প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ‘টেম্পার’মুক্ত ই-পাসপোর্ট ব্যবস্থা এবং সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ‘এলিট’ (অভিজাত) দেশগুলোর গ্রুপে ঢুকছে বলে জানিয়েছে ঢাকায় জার্মান দূতাবাস। আনুষ্ঠানিকভাবে ই-পাসপোর্ট উদ্বোধনের প্রাক্কালে গতকাল জার্মান দূতাবাস এ কথা জানায়। জার্মানি বাংলাদেশের এই অগ্রগতিকে স্বাগত এবং বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়েছে।

জার্মান দূতাবাস জানায়, ই-পাসপোর্ট ও স্বয়ংক্রিয় সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন বাংলাদেশ ও জার্মানির মধ্যে সহযোগিতার একটি মাইলফলক। এটি একই সঙ্গে সুবিধা ও নিরাপত্তার জন্যও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

জার্মান দূতাবাস আরো জানায়, বাংলাদেশের জন্য এই প্রকল্প বিশ্বের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা প্রয়োজনীয়তা পূরণ করে সর্বাধুনিক প্রজন্মের ইলেকট্রনিক ট্রাভেল ডকুমেন্টের পথে রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই প্রকল্প স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর এবং জার্মান কম্পানি ভেরিডস জিএমবিএইচের সফল অংশীদারির প্রতিফলন।

দূতাবাস জানায়, ই-পাসপোর্ট বাংলাদেশের নাগরিকদের আন্তর্জাতিক ভ্রমণ আরো সুবিধাজনক ও নিরাপদ করবে। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তায়ও ভূমিকা রাখবে।

ই-পাসপোর্ট প্রবর্তনকে বাংলাদেশের আধুনিকায়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লক্ষ্য পূরণের অংশ হিসেবে দেখছে জার্মান দূতাবাস। তারা বলেছে, জার্মানি প্রমাণ করেছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ওই লক্ষ্য পূরণে সহযোগিতা দিতে জার্মানি প্রস্তুত।

জার্মান দূতাবাস বলেছে, জার্মান উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে সর্বোচ্চ মানের এবং সর্বাধুনিক প্রযুক্তি প্রদানের মাধ্যমে আরো ব্যবসা ও সহযোগিতায় সম্পৃক্ত হতে চায়।

জানা যায়, প্রতিদিন পাসপোর্টের বই প্রয়োজন হয় দুই লাখ। আমদানি হচ্ছে এক লাখ ৮০ হাজার করে। প্রতি মাসে ২০ হাজার বই সরবরাহে ঘাটতি থাকে। এভাবে গত কয়েক মাসে দুই লক্ষাধিক পাসপোর্ট বইয়ের সংকট তৈরি হয়েছে। বর্তমানে তিন লাখ পাসপোর্টের আবেদন ঝুলে আছে। তাঁদের মধ্যে যাঁদের তদবিরের জোর আছে তাঁরা পাসপোর্ট পাচ্ছেন।

পাসপোর্ট সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মুনিম হাসান গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পাসপোর্ট বই সংকটের কারণে এ সমস্যা তৈরি হয়েছে। ই-পাসপোর্ট সরবরাহ কার্যক্রম শুরু হলে এই সংকট কেটে যাবে। ই-পাসপোর্ট উদ্বোধনের পর একসঙ্গে ই-পাসপোর্ট ও এমআরপি পাসপোর্ট ইস্যু করা হবে।’

দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশেই প্রথম ই-পাসপোর্ট চালু হচ্ছে। এ জন্য হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ছয়টি ই-গেট স্থাপন করা হয়েছে। তিনটি বিদেশ থেকে আগতরা ব্যবহার করবেন। বাকি তিনটি যাঁরা বিদেশে যাবেন তাঁদের জন্য।

মুনিম হাসান জানান, পর্যায়ক্রমে দেশের বিমান ও স্থলবন্দরে ৫০টি ই-গেট স্থাপন করা হবে। ইতিমধ্যে ই-পাসপোর্টের ২০ লাখ বই আনা হয়েছে। তা দিয়ে আগামী ১০ মাস নিশ্চিন্তে ই-পাসপোর্ট দেওয়া যাবে।

আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসের সামনে গতকাল বেশ কয়েকজন আবেদনকারীর সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তাঁরা প্রত্যেকেই সময়মতো পাসপোর্ট না পেয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন। তাঁরা জানান, পাসপোর্ট পেতে প্রতিদিন অসহনীয় যানজট ঠেলে এখানে এসে দৌড়ঝাঁপ করেও কোনো কাজ হচ্ছে না।

শফিক নামে এক ব্যক্তি রাজধানীর বাড্ডা এলাকার বাসিন্দা। প্রবাসী এই ব্যক্তি পাসপোর্ট রিনিউ করতে না পেরে বিদেশে যেতে পারছেন না। তিনি জানান, সাত দিনে জরুরি ভিত্তিতে পাসপোর্ট পেতে ফি জমা দিয়েছেন গত ২ ডিসেম্বর। অথচ দেড় মাসের বেশি সময়েও পাসপোর্ট হাতে পাননি। এ সময়ের মধ্যে তিনি তিনবার পাসপোর্টের খোঁজ নিতে আগারগাঁওয়ে আসেন। প্রতিবারই পাসপোর্ট অফিস থেকে জানানো হয়েছে যে পাসপোর্ট প্রিন্ট হচ্ছে। অবশেষে গতকাল সন্ধ্যায় তিনি পাসপোর্ট পেয়েছেন।

আরেক আবেদনকারী খসরু নোমান খানের চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়ার কথা ছিল তিন মাস আগে। সে অনুযায়ী পাসপোর্টের জন্য আগেভাগেই আবেদনও করেছিলেন। কিন্তু সেই পাসপোর্ট পেয়েছেন গতকাল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সারা দেশেই পাসপোর্ট অফিসের সামনে যেন হাহাকার চলছে। বিশেষ করে যাঁরা চিকিৎসার্থে দ্রুত দেশের বাইরে যেতে চান আর যাঁরা নির্দিষ্ট দিনে দেশের বাইরে থাকার কথা, তাঁদের কাকুতি-মিনতিতে পাসপোর্ট অফিসের কর্মীরাও যেন দিশেহারা।

এক কর্মকর্তা জানান, পাসপোর্ট বই না থাকায় এই সংকট তৈরি হয়েছে বলে আবেদন প্রার্থীদের তাঁরা জানাচ্ছেন। কিন্তু কেউ কথা শুনতে চান না। তাঁরা দ্রুত পাসপোর্ট চান। ফলে চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি আরো জানান, ই-পাসপোর্টের আবেদন করার জন্য অনেকে অপেক্ষা করছেন। ফলে এমআরপির আবেদন কমে এসেছে। তবে ই-পাসপোর্ট চালুর দিনেই অর্ধলক্ষাধিক আবেদন জমা পড়বে এমনটা ধারণা করা হচ্ছে।