ইসলাম ধর্ম আক্রান্ত চীনে, প্রকৃত ছবি তুলে ধরলো নিউ ইয়র্ক টাইমস

Social Share

এক দশক আগেও ছবিটা ছিল অন্যরকম। হাজার হাজার তীর্থযাত্রীর ভিড়ে মুখরিত হয়ে উঠতো চীনের পশ্চিম সীমান্তের মরুভূমিতে অবস্থিত ইমাম অসিমের মাজার। স্থানটি ছিল উইঘুর মুসলিমদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র। তাই তাঁরা, ভালো ফসল, পরিবারের সমৃদ্ধি বা সন্তানের মঙ্গলকামনায় ভিড় করতেন এখানে। ইমাম অসিমই হাজার বছরের বৌদ্ধ সাম্পাজ্যের পতন ঘটিয়ে প্রসার ঘটান ইসলাম ধর্মের।  উইঘুর সম্প্রদায়ের মুসলিমরা তাই প্রতি বছর এখানে জড়ো হতেন ইমাম সাহেবকে শ্রদ্ধা জানাতে। মাজারে কাপর চরাতেন। গাছে বাঁধতেন শাড়ির টুকরো। মেলা লাগতো ইমাম অসিমের মাজারে। সবই এখন অতীত।  উইঘুরদের মসজিদ-মাজার বেশিরভাগই তো এখন ধংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইমস স্যাটেলাইট ছবি সহযোগে প্রকাশ করেছে উইঘুরদের দুর্দশার চিত্র।  প্রতিবেদনে স্পষ্ট, চীনে বিন্দুমাত্র ধর্মীয় স্বাধীনতা নেই মুসলিমদের।
মিডলব্যুরি কলেজের অধ্যাপক টামার মায়ের ২০০৮-০৯ সালে অসিম মাজার ঘুরে এসেছিলেন। তিনি জানান, ‘তখনও মাজারটি ছিল জমজমাট। শুধুমাত্র মাজার দর্শনই নয়, নানা ধরনের কর্মসূচিতে জমজমাট ছিলো গোটা এলাকা। মেলা বসতো রীতিমতো। থাকত গান, কবিতা পাঠ থেকে শুরু করে হরেক রকম বিনোদনেরও বন্দোবস্ত। পালিত হতো সেখানে। ‘ তখনও অবশ্য ভিড় সামলানোত চেষ্টা করতেন চীনা কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ২০১৪ সালে পুরোদমে তীর্থযাত্রীদের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষিত হয় ইমাম অসিম মাজার দর্শন। গত বছর তো পুরোদমেই ধংসস্তুপে পরিণত হয় পবিত্র মুসলিম তীর্থস্থান। চীন ধংস করে ফেলেছে ইমাম অসিমের পবিত্র কবরস্থান। স্যাটেলাইট ছবিতেই ধরা পড়েছে সে দৃশ্য।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের দুই সাংবাদিক ক্রিশ বাকলে ও অস্টিন রেমজি তাঁদের প্রতিবেদনে শুধু ইমাম অসিম মাজারই নয়, জিনজিয়াং-এ মসজিদ ও মাজার ধংসের একাধিক তথ্য তুলে ধরেন।  চীনা কর্তৃপক্ষ ইদানিং কালে মুসলিমদের বহু স্থাপত্য ধংস করে ফেলেছে। আঘাত হেনে চলেছে মুসলিমদের ধর্ম বিশ্বাসের ওপর।  প্রতিবদেনে বলা হয়েছে উইধুরস, কাজাক-সহ অন্যান্যদের কমিউনিস্ট ভাবধারায় দিক্ষিত করতেই চীনাদের এই উদ্যোগ।  উইঘুরদের ব্রেনওয়াশ করার জন্য খোলা হয়েছে বহু মগজ ধোলাই কেন্দ্রও। ক্যানবেরার অস্ট্রেলিয়ান স্ট্যাটেজিক পলিসি ইন্সটিটিউট (এএসপিআই)-এর গবেষণায় উঠে এসেছে জিনজিয়াং-এ ২০১৭ সাল থেকে অন্তত সাড়ে আট হাজার পুরোপুরি ধংস করা হয়েছে।  গবেষক দলের প্রধান নাথান রুসের বলেন, ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লবের অঙ্গ হিসাবেই চলে আসছে এই ধংস প্রক্রিয়া।’ ১৯৬৬ সালে মাও জেদং ধর্মীয় স্থানের ওপর যেভাবে আঘাত হানা শুরু করেন, চীনে সেই পরম্পরা আজও চলছে।
এএসপিআই ৫৩৩টি পরিচিত মসজিদের উপগ্রহ মারফত প্রাপ্ত বিভিন্ন সময়কার ছবি বিশ্লেষণ করেই এই অভিমত ব্যক্ত করে। তাঁরা যাচাই করেন অনলাইন থেকে প্রাপ্ত সরকারি ৩৮২ টি স্থানের তথ্যও। সেগুলি বিশ্লেষণ করে তাঁদের এই অভিমত। কিন্তু মানতে নারাজ চীন। চীনা কর্তৃপক্ষের পাল্টা দাবি, এঅসপিআই-এর বক্তব্য পুরোপুরি ভুল। তাঁরা নাকি সংস্কারের কাজ করছেন মসজিদের। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ণে চীনের বদনাম করতেই নাকি এইসব প্রকাশিত। এএসপিআই অবশ্য চীনের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে নিজেদের সত্যনিষ্ঠ গবেষণার কথাই বলেছে।
চীন সরকারের শতবাধা ডিঙিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমস গবেষণা পত্রের সত্যতা যাচাই করে। খতিয়ে দেখে উপগ্রহ চিত্রও। তাতে করে গবেষণা পত্রের সত্যতাই প্রতিষ্ঠিত হয়। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের উইঘুর সঙ্গিত ও কলা বিশেষজ্ঞ র‌্যাচেল হ্যারিস গবেষণা পত্রটি পর্যালোচনা করে বলেন, ‘উইঘুরের স্থাপত্য ও ঐ্রতিহ্যকে ইচ্ছাকৃতভাবে ধংস করার প্রক্রিয়া চলছে, এটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।’ টামার মেয়ের জানাচ্ছেন, ২০০৮ সালেও ইমাম অসিম মাজারের মেলা প্রাঙ্গন ছোটদের খেলাধূলা ও বিনোদনের জমজমাট বন্দোবস্ত ছিল।  মানুষ ধর্মীয় কারণের পাশাপাশি সাপ্তাহিক বেড়ানোর জন্যও পছন্দ করতেন ইমাম অসিম মাজার। কিন্তু উইঘুরদের ইসলাম ধর্মের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস চীনের সহ্য হয়নি। তাই ধংস করা হয় ইমাম অসিম মাজার। আঘাত হানা হয় মুসলিমদের ধর্মবিশ্বাসের ওপর। হাজার বছরের পুরনো ধর্মবিশ্বাসের ওপরই আঘাত হানছে কমিউনিস্ট প্রশাসন।
চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের সবচেয়ে বড় মাজারটি হলো অর্ডাম মাজার। ৪০০ বছরেরও বেশি পুরনো এই মাজারে উইঘুরদের মধ্যে বৌদ্ধ্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়ে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তকের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে দক্ষিণ জিনজিয়াং-এর দক্ষিণ প্রান্তের এই মাজারেও প্রচুর মানুষ আসতেন। নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রিয়ান থাম নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, ‘আমি সেখানে বয়স্কদেরও কাঁদতে দেখেছি।’ উইঘুরদের ধর্মবিশ্বাস আর ইসলাম ধর্মের বিস্তারে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মনে ভয় ধরে যায়। মুসলিমদের মাজারে ভিড় অসন্তুষ্ট করে তোলে চীনা কর্তৃপক্ষকে। ১৯৯০ সাল থেকেই সরকারি আক্রমণের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ান উইঘুররা। ১৯৯৭ সালে অর্ডাম মাজারে নিষিদ্ধ ঘোষিত হয় সবধরনের উতসব। তারপর একইভাবে অন্যান্য মাজারেও নেমে আসে নিষেধাজ্ঞা। কেড়ে নেওয়া হয় মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও লুন্ঠিত হয় চীন সরকারের অত্যাচারে।
অর্ডাম মাজারে চীনা নজর এড়িয়ে কেউ কেউ অবশ্য এখনও যাওয়ার চেষ্টা করেন। আসলে এই মাজার উইঘুর মুসলিমদের কাছে খুবই পবিত্র। নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থাম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে এক উইঘুর নারী অর্ডামের কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন। এটা জানতে পেরেই গ্রামের বাকিরা তাঁর পোষাকে লেগে থাকা ধুলো-বালিটুকুই পবিত্র মনে সংগ্রহ করেন। এর থেকেই বোঝা যায় উইঘুরদের কাছে অর্ডাম কতোটা পবিত্র।’ আসলে এই নিষেধাজ্ঞা চীন সরকারের মুসলিম বিরোধী কর্মকান্ডের আভাষ মাত্র। আসল চরিত্র আরও নির্মম। ২০১৮ সালের প্রথম দিকেই অর্ডাম মাজার ধংস করা হয়। অথচ এই মাজারটি ছিল মরুভূমির মধ্যে। লোকালয় থেকে অন্তত ৫০ মাইল দূরে। উপগ্রহ ছবিতে ধরা পড়ে মাজার, মসজিদ, নামাজের কক্ষ, থাকার ঘর সব ধংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। সেখানে একটি বিশালাকার রান্নার পাত্র ছিল। তীর্থযাত্রীরা সেখানে মাংস থেকে আনাজ সবকিছু ঢেলে দিতো। রান্না হতো পবিত্র খাবারের। সেটিরও কোনও হদিশ নেই। অধ্যাপক থাম বলেন, ‘উইঘুরদের কাছে জায়গাটি ছিলো খুবই পবিত্র। খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভেঙে ফেলা হলো অর্ডাম মাজার।’ উন্নয়নের দোহাই দিয়ে চীন সরকার ধংস করে চলেছে একের পর এক মসজিদ। গত বছর নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিকরা দক্ষিণ জিনজিয়াঙের হটন শহরে একটি নতুন পার্ক দেখতে পান। অথচ উপগ্রহ চিত্রে স্পষ্ট ২০১৭ সাল পর্যন্ত এই পার্কেই ছিল মসজিদ।
শুধু এই পার্কটিই নয়, সাংবাদিকদের নজরে আসে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে মসজিদের জায়গায় গড়ে উঠেছে পার্ক, খেলার মাঠ বা অন্য কিছু।  মসজিদ ভাঙার দৃশ্যও তাঁদের নজরে আসে। হটনের মূল মসজিদটি অবশ্য তখনও খোলা ছিল। শুক্রবার জনাকতক পছন্দের লোককে নমাজ পড়তে দেওয়া হয়। জিনজিয়াঙের আরেকটি বড় শহর কাশগরে তো একটি মসজিদকে পানশালায় পরিণত করা হয়। সাংবাদিকদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাকিগুলি বন্ধ। ভিতের আসবাবপত্রের জমে থাকা ধুলোই প্রমাণ করে, সেগুলি খোলার অধিকার নেই উইঘুর মুসলিমদের। কাশঘরের মামুতিজান আব্দুরেহিম বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশুনো করছেন। তাঁর স্ত্রী থাকেন কাশগরেই। কিন্তু স্ত্রীর কোনও খবর নেই। উইঘুরদের দুর্দশার প্রসঙ্গে মামুতিজান বলেন, ‘আসলে তো আমরা আমাদের পরিবার-পরিজনকেই তো হারাতে বসেছি। আমাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আমাদের শরীর থেকে রক্ত-মাংস খুবলে নেওয়ার মতো করে মসজিদগুলি ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে।’
অবশ্য উইঘুরদের ওপর এধরনের অত্যাচার বা ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ চীনে নতুন কিছু নয়। এর আগেও বহুবার বাঙা হয়েছে মসজিদ। পরে ফের মসজিদ গড়েও তুলেছেন উইঘুররা। কিন্তু এবার আক্রমণের তীব্রতা অনেক বেশি। তাঁদের ওপর সংগঠিত বর্বরতার মাত্রাও অনেক বেশি। এমনকী, সন্তানধারণের অধিকারও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। মহিলাদের বাধ্য করা হচ্ছে চীনের মূল ভূখণ্ডের বাসিন্দাদের সঙ্গে বিয়ে করতে। চলছে নানা ধরনের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। লাগামহীন অত্যাচার সহ্য করেও উইঘুরদের কেউকেউ বিশ্বাস করেন, ফের তাঁরা ফিরে পাবেন পবিত্র নামাজের অধিকার। মৃত্যুর পর লাশ কবর দেওয়ার অধজিকারও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে পরিজনদের কাছ থেকে। তাঁরা শেষ শ্রদ্ধাটুকুও জানাতে পারছেন না কমিউনিস্ট শাসনে। তবু তাঁদের বিশ্বাস, বিশ্বজনমতের কাছে একদিন মাথানত করতে বাধ্য লহবে অত্যাচারী চীনের শাসককূল। জয় হবে মানবাধিকারের। অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী কাশগরের মামুতিজানেরও তাই বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘উইঘুরদের ওপর জুলুম-অত্যাচার অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তবু আমাদের অনেকেরই বিশ্বাস এই অত্যাচার দীর্ঘস্থায়ী হবেনা। অনেকেই আশাবাদী। সেই আশাবাদীদের দলে রয়েছি আমি।’ এখন দেখার চীনের অত্যাচারের হাত থেকে উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায়ের কবে নিস্তার মেলে। মুসলিম দুনিয়াকে অবশ্য টাকার জোড়ে ভুলিয়ে রেখেছে চীন। ফলে উইঘুরদের ওপর অমানবিক অত্যাচারেও প্রায় নিরব দর্শকের ভূমিকায় মুসলিম দেশগুলি।