ইসরায়েল ফিলিস্তিন সংঘাত: উভয় পক্ষেরই ‘বিজয়’ দাবির মধ্যে আল-আকসায় আবার উত্তেজনা

45
Social Share

এগারো দিন পর ইসরায়েল ফিলিস্তিন লড়াইয়ের অবসান হয়েছে, যাতে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ২৫০ জন, যাদের বেশির ভাগই মারা গেছে গাযায়।

ইসরায়েল এবং হামাস দু পক্ষই দাবি করছে এই লড়াইয়ে তাদের বিজয় হয়েছে।

এরই মধ্যে আজ জুমার নামাজের পর আল-আকসা মসজিদ এলাকা থেকে দাঙ্গার খবর এসেছে।

ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফ বলছে গাযায় ১১ দিনের লড়াইয়ে তারা ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাস এবং ইসলামিক জিহাদের ২৫জন উর্ধ্বতন কমান্ডার ও দু’শর মত সক্রিয় সদস্যকে হত্যা করেছে।

তবে ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে গাযায় ২৪৩ জন মারা গেছে, যার মধ্যে ৬৬ জন শিশু এবং ৩৯জন নারী। হামাস তাদের যোদ্ধাদের হতাহতের কোন পরিসংখ্যান দেয়নি।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বিনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাদের সামরিক অভিযান “অভুতপূর্ব সফল” দাবি করে বলেছেন তারা বিমান হামলা চালিয়ে হামাসের ১০০ কিলোমিটার বিস্তৃত সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বিধ্বস্ত করে দিয়েছে এবং ইসরায়েলের শহর লক্ষ্য করে হামাসের রকেট নিক্ষেপের ক্ষমতা নষ্ট করে দিয়েছে।

আইডিএফ দাবি করেছে হামাসের সামরিক শাখা যেসব বহুতল ভবন থেকে তাদের কর্মকাণ্ড চালাত এরকম নয়টি ভবন, গাযায় হামাসের ১০টি সরকারি দপ্তর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ১১টি শাখা অফিস এবং ৫টি ব্যাংকে তারা বোমাবর্ষণ করেছে।

তারা আরও দাবি করেছে তাদের আয়রন ডোম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হামাসের ছোঁড়া ৯০% রকেট ভূপাতিত করে বিধ্বস্ত করেছে। তারা বলেছে ১১ দিনের লড়াইয়ে হামাস ইসরায়েলকে টার্গেট করে ৪,৩৪০টির বেশি রকেট নিক্ষেপ করেছে।

গাযা সিটির ওপর ইসরায়েলি বিমান হামলার পর ধোঁয়া উঠছে -১৬ই মে ২০২১
গাযার ওপর ইসরায়েল বিধ্বংসী বিমান হামলা চালিয়েছে ১১দিন ধরে

হামাসের প্রতিক্রিয়া

বিবিসির মধ্যপ্রাচ্য সম্পাদক জেরেমি বোওয়েন বলছেন, হামাসের একজন শীর্ষ নেতা গাযায় বিবিসিকে বলেছেন যে ইসরায়েল “শেখ জারা এবং আল-আকসা মসজিদ থেকে সরে যাবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে”। মুসলিমদের জন্য অন্যতম সবেচেয়ে পবিত্র একটি মসজিদ হল আল-আকসা।

জেরুসালেমের এই শেখ জারা এলাকায় ফিলিস্তিনি কয়েকটি পরিবারকে তাদের বাড়ি থেকে উৎখাত করাকে কেন্দ্র করেই এবারের সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল।

তবে এরকম কোন প্রতিশ্রুতি বা সমঝোতার কথা ইসরায়েল অস্বীকার করেছে। তারা বলেছে তাদের যুদ্ধবিরতি কোন শর্তসাপেক্ষে হয়নি।

হামাসের একজন কর্মকর্তা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস সংবাদ সংস্থাকে বলেছেন ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য একটা “বিজয়”।

এই বিজয়ের আনন্দ দেখা গেছে পুরো গাযা জুড়ে। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর রাস্তায় নেমে এসে আনন্দ উল্লাস করেছে গাযার জনগণ। “আজ বিজয়ের দিন, স্বাধীনতার দিন, আমাদের জন্য সবচেয়ে আনন্দের একটা দিন,” বলেছেন একজন ফিলিস্তিনি।

গত রাতে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর গাযার রাস্তায় মানুষের বিজয়োল্লাস
গত রাতে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর গাযার রাস্তায় মানুষের বিজয়োল্লাস

তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক হামাস কাউন্সিলের সদস্য বাসেম নাঈম বিবিসিকে বলেছেন, এই যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হবে কিনা তা নিয়ে তার সংশয় রয়েছে। “ফিলিস্তিনিদের প্রতি ন্যায় বিচার এবং ইসরায়েলের আগ্রাসন ও নৃশংসতা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত এর স্থায়িত্ব” নিয়ে তিনি সন্দিহান।

হামাসের রাজনৈতিক শাখার একজন সদস্য ইজ্জাত আল-রেশিক ইসরায়েলের প্রতি সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন। “আজ যুদ্ধ থেমেছে সেটা ঠিক, কিন্তু নেতানিয়াহু এবং সারা বিশ্বের জানা উচিত যে আমাদের আঙুল ট্রিগারে রাখাই আছে এবং প্রতিরোধের প্রয়োজনে তার গতি বাড়ানো অব্যাহত থাকবে,” তিনি বলেছেন রয়টার্স সংবাদ সংস্থাকে।

আল-আকসায় আবার সংঘাত

এই প্রতিবেদন লেখার সময় জানা গেছে জেরুসালেমের পুরনো শহর এলাকায় জুমার নামাজের পর আল-আকসা মসজিদ চত্বরে ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারী ও ইসরায়েলি পুলিশের মধ্যে আবার সংঘর্ষ হয়েছে।

ইসরায়েলি পুলিশ বাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে “নামাজ শেষ হওয়ার পরপরই দাঙ্গা বাঁধে”।

বিবৃতিতে বলা হয় কাছের এক ফটকের কাছে পুলিশ অফিসারদের লক্ষ্য করে কয়েকশ তরুণ পাথর এবং মলোটভ ককটেল ছুঁড়তে শুরু করে। জেরুসালেমের পুলিশ কমান্ডার “দাঙ্গাকারীদের ঠেকাতে” পুলিশ অফিসারদের ভেতরে ঢোকার নির্দেশ দিয়েছে বলে বিবৃতিতে জানানো হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছে পুলিশ অফিসাররা স্টান গ্রেনেড এবং কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়েছে।

আল-আকসা মসজিদ চত্বরে জুমার নামাজের পর
যুদ্ধবিরতির পরেও গাযায় উত্তেজনা রয়েছে, আল-আকসায় আবার দাঙ্গার খবর আসছে

‘নতুন সংঘাতের বীজ’

ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে ২০০৮ সালের পর এটা ছিল চতুর্থ বড় যুদ্ধ। বিবিসির জেরেমি বোওয়েন বলছেন এধরনের প্রত্যেকটা বড় লড়াই, এমনকি মাঝখানের প্রত্যেকটা ছোটখাট সংঘাতেরও পরও দুপক্ষই তাদের বিজয় দাবি করে বক্তব্য দিয়েছে। এবং এই পাল্টাপাল্টি দাবির মধ্যে দিয়ে তারা পরবর্তী সংঘোতের বীজ বপন করেছে।

তিনি বলছেন মূল সমস্যার ফলপ্রসূ সমাধান যতদিন না হচ্ছে, দু পক্ষের মধ্যে এই সংঘাত ততদিন ছাই চাপা আগুনের মতই জ্বলবে। “আবার নতুন দফা লড়াই আমরা দেখব”।

দু পক্ষেই ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বা ইসরায়েলি বিমান হামলায় যারা স্বজন হারিয়েছেন তারা এটাকে বিজয় হিসাবে দেখছেন না।

বেশিরভাগ প্রাণ হানি হয়েছে গাযায়, বহু ফিলিস্তিনি ঘরবাড়ি, পরিবার পরিজন সর্বস্ব হারিয়েছেন। গাযায় লক্ষ লক্ষ ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, বহু বাসভবন ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে।

সব হারানো বহু মানুষ এখন কীভাবে তাদের জীবন গুছিয়ে তুলবেন তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। এই যুদ্ধবিরতি আদৌ টিকবে কিনা, ভবিষ্যতে তাদের জন্য নতুন করে যুদ্ধের দামামা আবার কখন বেজে উঠবে এই চরম অনিশ্চয়তা আর উদ্বেগ কাটছে না বলেই তারা জানিয়েছেন।

গাযায় কর্তৃপক্ষ বলছে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ১৮০টির বেশি বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন বিধ্বস্ত হয়েছে
গাযায় কর্তৃপক্ষ বলছে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ১৮০টির বেশি বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন বিধ্বস্ত হয়েছে

ফিলিস্তিনিদের ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ হয়েছে

লেবাননের শিয়া গোষ্ঠী হেযবোল্লাহ এই লড়াইয়ে ফিলিস্তিনিদের “বীরের মত লড়াই করার” প্রশংসা করেছে।

“ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ (ইসরায়েলের সাথে) লড়াইয়ে নতুন মোড় তৈরি করেছে। তাদের প্রতিরোধ আগামীতে তাদের জন্য বড় বিজয়ের পথ প্রশস্ত করবে,” হেযবোল্লাহ বলেছে।

তারা আরও বলেছে হামাসের “এই বিজয় ঐ এলাকায় ভবিষ্যত সংঘাতের ক্ষেত্রে কৌশলগত, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সব দিক দিয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।”

ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের শত্রু ইরান হেযবোল্লাহকে ভারী অস্ত্র এবং অর্থ সহায়তা দেয়। লেবানিজ সেনাবাহিনীর পাশাপাশি লেবাননে হেযাবোল্লাহ রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে খুবই প্রভাবশালী শক্তি।