বিশেষ প্রতিবেদন :
ভিনিউজ : দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার পর বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন গত তিন বছর ধরে কমছে। একই সঙ্গে কমে যাচ্ছে মাছটির গড় ওজনও। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মৎস্য বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা। তাদের মতে, উৎপাদন ও আকার—দুটোরই এই নিম্নমুখী প্রবণতা ইলিশের ভবিষ্যৎ মজুদের জন্য সতর্কবার্তা হতে পারে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০২-০৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন ছিল ১ লাখ ৯৯ হাজার মেট্রিক টন। পরবর্তী দুই দশকে নানা সংরক্ষণমূলক উদ্যোগের ফলে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টনে পৌঁছায়। তবে এরপর থেকে উৎপাদন কমতে শুরু করে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন নেমে আসে ৫ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টনে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে হয় ৫ লাখ ৪ হাজার মেট্রিক টন। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদন ৫ লাখ টনের নিচে নেমে যেতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্যাহ বলেন, ২০২১ সাল পর্যন্ত উৎপাদন বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলেও এখন তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে বাজারে বড় ইলিশের সংখ্যা কমে গিয়ে ছোট আকারের ইলিশ বেশি দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশের জীবনচক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নদী থেকে সাগরে এবং পরে সাগর থেকে নদীতে চলাচল। কিন্তু নদী-মোহনা ও উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক হারে ছোট ইলিশ বা জাটকা ধরার কারণে অনেক মাছ পূর্ণবয়স্ক হওয়ার আগেই ধরা পড়ে যাচ্ছে। ফলে বড় আকারের ইলিশের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।
গবেষক ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. আনিসুর রহমান বলেন, “জাটকা বড় হওয়ার সুযোগ না পেলে বড় ইলিশ পাওয়া সম্ভব নয়। পরপর কয়েক বছর এভাবে চলতে থাকলে উৎপাদনে বড় ধরনের ধস নামতে পারে।”
মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু নদীতেই নয়, সাগরেও সমস্যা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক বাণিজ্যিক ট্রলার উপকূলের অগভীর এলাকায় গিয়ে ছোট ইলিশ ধরছে। এতে প্রাকৃতিকভাবে মাছের মজুদ পুনর্গঠনের সুযোগ কমে যাচ্ছে।
এছাড়া নদী দূষণ, নাব্যতা সংকট এবং চর জেগে ওঠার কারণে ইলিশের স্বাভাবিক চলাচলের পথ বা মাইগ্রেশন রুট ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে প্রজনন ক্ষেত্র ও নার্সারি গ্রাউন্ডও হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কারণে উৎপাদন ও ওজন-দুটোর ওপরই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে ইলিশের পাঁচটি অভয়াশ্রম রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু অভয়াশ্রম ঘোষণা করলেই হবে না, সেখানে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। নদী ও সাগরে অবৈধ মাছ ধরা বন্ধ করা না গেলে পরিস্থিতির উন্নতি কঠিন হবে।
গবেষকরা আরও বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে। মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, নদীতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত পরিবর্তন ইলিশের প্রজনন ও বিচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
বাংলাদেশ বিশ্বের মোট ইলিশ উৎপাদনের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ উৎপাদন করে বলে সরকারি দাবি। দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে এই মাছ থেকে। ফলে ইলিশ শুধু একটি জনপ্রিয় খাদ্য নয়, জাতীয় অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব ইতোমধ্যে বাজারে পড়তে শুরু করেছে। বড় আকারের ইলিশের দাম কয়েক হাজার টাকা কেজি ছাড়িয়ে গেছে। ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে মাছটি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাগরভিত্তিক নতুন প্রকল্প গ্রহণের চিন্তা করছে সরকার। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, ইলিশের উৎপাদন ও ওজন আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সময় লাগবে। এজন্য নদী ও সাগরে কঠোর নজরদারি, জাটকা সংরক্ষণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিকল্প নেই।
-বিবিসি বাংলা তথ্য অবলম্বনে




