বিশেষ প্রতিবেদন
ভিনিউজ : সন্তানধারণের ইচ্ছা থাকলেও বিপুল চিকিৎসা খরচ অনেক মার্কিন দম্পতির সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (আইভিএফ) চিকিৎসার ব্যয় অত্যন্ত বেশি হওয়ায় বিকল্পের সন্ধানে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন অনেকেই। তাঁদের পছন্দের তালিকায় উঠে আসছে ইউরোপের গ্রিস, স্পেন ও চেকিয়া। চিকিৎসার পাশাপাশি এসব দেশে কয়েক দিন অবকাশ কাটানোর সুযোগও থাকায় এই প্রবণতা পরিচিতি পেয়েছে ‘ফার্টিলিটি ট্যুরিজম’ নামে।
যুক্তরাষ্ট্রে আইভিএফের খরচ অনেক পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে চলে যেতে পারে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে একটি আইভিএফ চক্রেই প্রায় ৪০ হাজার ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে। এর সঙ্গে ওষুধ, জিনগত পরীক্ষা, ভ্রূণ সংরক্ষণ, গর্ভাবস্থার চিকিৎসা এবং প্রসবের খরচ যোগ হলে পুরো প্রক্রিয়ার ব্যয় আরও বেড়ে যায়। অনেকের ক্ষেত্রে প্রথম চেষ্টায় সাফল্য না আসায় একাধিকবার আইভিএফ করতে হয়। ফলে মোট খরচ কয়েক গুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
জুলাইয়ে প্রকাশিত উইমেন্স রিপ্রোডাক্টিভ হেলথ ফাউন্ডেশনের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, বিমা সুরক্ষার আওতায় থাকা মার্কিন সন্তানকামী দম্পতি বা একক মায়ের ক্ষেত্রেও একটি আইভিএফ প্রক্রিয়ার গড় খরচ ২৯ হাজার ডলারের বেশি। ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ২৭-২৮ লক্ষ টাকা। চিকিৎসার অন্যান্য খরচ যোগ করলে একটি সন্তানের জন্ম পর্যন্ত মোট ব্যয় ৫৪ হাজার ডলারেরও বেশি হতে পারে।
তবে সবার ক্ষেত্রে বিমা এই খরচ বহন করে না। অনেক দম্পতিকেই চিকিৎসার বড় অংশের টাকা নিজেদের পকেট থেকে দিতে হয়। এ কারণেই তুলনামূলক কম খরচে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ রয়েছে- এমন দেশের দিকে নজর বাড়ছে তাঁদের।
ফার্টিলিটি ট্যুরিজমের একটি উদাহরণ ফ্লরিডার এমিলি ও জাস্টিন সলোমনের ক্ষেত্রে দেখা যায়। বিপুল খরচের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে আইভিএফ চিকিৎসার বিকল্প খুঁজছিলেন তাঁরা। পরে গ্রিসে চিকিৎসার খরচ সম্পর্কে জানতে পেরে সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আথেন্সের একটি ক্লিনিকে তাঁদের চিকিৎসায় মোট খরচ হয় প্রায় ১২ হাজার ডলার, অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ১১ লক্ষ টাকা। এই খরচের মধ্যে ওষুধ, ডিম্বাণু সংগ্রহ, নিষেক, ভ্রূণ সংরক্ষণ এবং পরবর্তী সময়ে ভ্রূণ জরায়ুতে প্রতিস্থাপনের মতো পরিষেবা অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে যাতায়াতের খরচ এর মধ্যে ধরা হয়নি।

চিকিৎসার পুরো প্রক্রিয়া এক সফরে শেষ না হওয়ায় ওই দম্পতিকে দু’বার গ্রিস যেতে হয়েছিল। প্রথম সফরে হরমোন প্রয়োগের মাধ্যমে একাধিক ডিম্বাণু প্রস্তুত করা হয়। পরবর্তী ধাপে ডিম্বাণু সংগ্রহ ও নিষেকের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্টের ফাঁকে তাঁরা গ্রিসের পর্যটনকেন্দ্রও ঘুরে দেখেন। এজিয়ান সাগরের তীরে মিলোস দ্বীপে এক সপ্তাহ কাটিয়েছিলেন তাঁরা। চিকিৎসার ব্যস্ততার পাশাপাশি নৌকায় দ্বীপ ঘোরার মতো অভিজ্ঞতাও হয় তাঁদের।
ফলে চিকিৎসা ও ভ্রমণ—দুইয়ের সমন্বয় ঘটছে এই নতুন ধরনের পর্যটনে। ইউরোপীয় ফার্টিলিটি সোসাইটির চেয়ারম্যান ইয়াকুব ডিজেউস্কির দাবি, গত এক বছরে ইউরোপের ফার্টিলিটি ক্লিনিক বেছে নেওয়া মার্কিন রোগীর সংখ্যা ৩৭ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।

ইউরোপের প্রতি এই আগ্রহের পেছনে শুধু খরচ কম হওয়াই কারণ নয়। আধুনিক প্রযুক্তি, অভিজ্ঞ চিকিৎসক এবং উন্নত প্রজনন চিকিৎসার সুযোগও বিদেশি রোগীদের আকৃষ্ট করছে। অনেক ইউরোপীয় ক্লিনিকের সাফল্যের হারও যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিনিকগুলোর সঙ্গে তুলনীয় বলে দাবি করা হয়। ফলে কম খরচে চিকিৎসা নিতে গিয়ে চিকিৎসার মানের সঙ্গে বড় ধরনের আপস করতে হচ্ছে না-এমন ধারণাও তৈরি হয়েছে।
স্পেন আন্তর্জাতিক রোগীদের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই জনপ্রিয় প্রজনন চিকিৎসাকেন্দ্র। দেশটির বড় ফার্টিলিটি ক্লিনিক নেটওয়ার্ক এবং বিদেশি রোগীদের চিকিৎসার অভিজ্ঞতা রয়েছে। অন্যদিকে, গ্রিস তুলনামূলক কম খরচের চিকিৎসার পাশাপাশি সমুদ্র, দ্বীপ ও মনোরম পরিবেশের কারণে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
চেকিয়াও আন্তর্জাতিক রোগীদের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফার্টিলিটি চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। দেশটির বিভিন্ন ক্লিনিক দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি দম্পতিদের প্রজনন চিকিৎসা দিয়ে আসছে। ফলে তুলনামূলক কম খরচে উন্নত চিকিৎসার সন্ধানে থাকা মার্কিন দম্পতিদের কাছে স্পেন, গ্রিস ও চেকিয়া ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠছে।

সন্তানলাভের চিকিৎসা যখন অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে, তখন চিকিৎসার খরচ কমানোর পাশাপাশি ভ্রমণের সুযোগও পাচ্ছেন অনেক দম্পতি। আর সেই কারণেই ইউরোপে ‘ফার্টিলিটি ট্যুরিজম’ এখন শুধু চিকিৎসার প্রবণতা নয়, বরং আন্তর্জাতিক পর্যটনেরও একটি নতুন ধারায় পরিণত হচ্ছে।




