আ’লীগের বিদ্রোহীরা চান ‘ওপেন ফিল্ড’

একের পর এক হুমকি-ধমকি। দলীয়ভাবেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীরা নিজেদের সিদ্ধান্তে অনড়। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে প্রার্থীর পরিবর্তন, নতুবা দল সমর্থিতরাসহ সবাই যাতে নির্বাচন করতে পারেন, সেজন্য ‘ওপেন ফিল্ড’ চান তারা। এ নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন চসিক নির্বাচনের সমন্বয়ক ও দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনসহ সংশ্নিষ্ট নেতারা। এক দফা উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার পর শেষবারের মতো চেষ্টা করতে কাল রোববার চট্টগ্রামে আসছেন খোদ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তখন কিছু একটা হবে বলে আশা করছেন এখানকার দলটির নেতারা।
নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে দলের সমর্থন বঞ্চিত হয়ে গণহারে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি নিয়ে বড় ধরনের দুর্ভাবনা তৈরি হয়েছে আওয়ামী লীগে। নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর ও নারীদের জন্য সংরক্ষিত ১৪টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতে বেশ কয়েকজন করে দলের সমর্থনপ্রত্যাশী ছিলেন। তবে তাদের মধ্য থেকে একজন করে প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়া হয়। এতেই জটিলতা তৈরি হয়। বেঁকে বসেন সমর্থনবঞ্চিত আওয়ামী লীগ নেতারা। মনোনয়নপত্র দেওয়ার শেষ দিনে দেখা যায়, চার-পাঁচটি ওয়ার্ড ছাড়া প্রতিটিতে বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। একেকটি ওয়ার্ডে একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। সব মিলিয়ে ৭০ জনেরও বেশি বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন ওয়ার্ডগুলোতে।
আওয়ামী লীগ নেতারা জানিয়েছেন, দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরা স্থানীয় আওয়ামী লীগের পাশাপাশি দলের হাইকমান্ডকেও ভাবিয়ে তুলেছেন। প্রায় সব ওয়ার্ডে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় দল সমর্থিত প্রার্থীদের জয় হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এটা হলে বিএনপি বাড়তি সুবিধা পাবে বলে মনে করা হচ্ছে। এজন্য যে কোনো মূল্যেই বিদ্রোহীদের সরাতে চাচ্ছে আওয়ামী লীগ।
দলের সমর্থনবঞ্চিত প্রার্থীদের নির্বাচনী মাঠ থেকে সরাতে নানাভাবে কাজ করে আসছিলেন দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগ নেতারা। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার নগরীর থিয়েটার ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে দলের সমর্থন পাওয়া এবং সমর্থনবঞ্চিত কাউন্সিলর প্রার্থীদের নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এক দফা বৈঠকে বসেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। ওই বৈঠকের দিকে তাকিয়েছিলেন দলের সমর্থন পাওয়া আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা। ধরে নেওয়া হয়েছিল, সেই বৈঠক থেকে ভালো কোনো ফল আসবে। কিন্তু বৈঠক শুরু হওয়ার পর বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীদের অনড় অবস্থান দেখে বিস্মিত হন সিনিয়র নেতারা। বৈঠকে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন যারা দলের সমর্থন পাননি তাদের সরে দাঁড়ানোর কথা বলতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন সমর্থনবঞ্চিত প্রার্থীরা। তাৎক্ষণিকভাবে এই প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন করে যাওয়ার কথা বলেন তারা। একপর্যায়ে অসন্তুষ্ট হয়ে দ্রুত সভা শেষ করে সভাস্থল ত্যাগ করেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনসহ আওয়ামী লীগ নেতারা।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন দলের বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীদের বিষয়ে বলেন, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ নির্বাচন করলে এর ফল ভালো হবে না। তারা দলের কোনো সহযোগিতা তো পাবেনই না, বরং তাদের বিষয়ে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের এমন কঠোর বার্তাকেও পাত্তা দিচ্ছেন না দলের সমর্থনবঞ্চিত কাউন্সিলর প্রার্থীরা।
তবে দল যাদের সমর্থন দিয়েছে, তাদের নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিদ্রোহী প্রার্থীরা। সিটি করপোরেশনের গোসাইলডাঙ্গা ওয়ার্ড থেকে দলের সমর্থন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া মোর্শেদ আলী অভিযোগ করেন, আমার ওয়ার্ডে দল থেকে যাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, তিনি দলের কেউ নন। বরং গত সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিরোধিতা করেছেন তিনি। ফলে তাকে মেনে নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। এলাকার নেতাকর্মীরা আমার সঙ্গে আছেন। তাই প্রার্থী হয়েছি। এভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেন আরও অনেক বিদ্রোহী প্রার্থী।
এ ব্যাপারে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, আওয়ামী লীগ একটি বড় দল। নির্বাচন করার মতো দলে অনেক যোগ্য নেতাকর্মী রয়েছেন। কিন্তু একটি ওয়ার্ডে একজনের বেশি তো প্রার্থী দেওয়ার সুযোগ নেই। দল যাকে যোগ্য মনে করেছে, তাকে সমর্থন দিয়েছে। সবার উচিত হবে দলের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া। কারণ দলের নেতাকর্মীরা বিভক্ত হয়ে পড়লে দলের ভোটব্যাংক ভাগ হয়ে যাবে। এটা মাথায় রেখে আমাদের কাজ করতে হবে। দলের প্রার্থীদের জিতিয়ে আনতে সবাইকে দলের সিদ্ধান্ত মেনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।