আমেরিকায় নির্বাচন: জো বাইডেনকে কেন অভিনন্দন জানাচ্ছেন না প্রেসিডেন্ট পুতিন

4
রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন। এখনও জো বাইডেনকে অভিনন্দন জানাননি তিনি
Social Share

ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন চার বছর আগে নির্বাচনে জেতেন তখন অতি দ্রুত যে কজন বিশ্বনেতা তাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন ভ্লাদিমির পুতিন ছিলেন তাদের অন্যতম।

২০১৬ সালের ৯ই নভেম্বর হিলারি ক্লিনটন পরাজয় মেনে নেওয়ার ১২ ঘণ্টার মধ্যে রুশ প্রেসিডেন্ট মি. ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানিয়ে বার্তা পাঠান।

কিন্তু এবার আমেরিকার নির্বাচনে জো বাইডেনকে বিজয়ী ঘোষণার দু’সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও প্রেসিডেন্ট পুতিন এখনও চুপ।

এ নিয়ে গত বেশ কিছুদিন ধরে নানা জল্পনার-কল্পনার পর প্রেসিডেন্ট পুতিন এখন স্বয়ং মুখ খুলেছেন।

গতকাল (রোববার) রুশ একটি টিভিতে এক সাক্ষাৎকারে তিনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন কেন তিনি বা তার সরকার জো বাইডেনকে অভিনন্দন জানাতে এখনো প্রস্তুত নন।

‘নষ্ট সম্পর্ক নতুন করে নষ্ট হয় না’

রুশ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক মিডিয়ার খবর অনুযায়ী, ভ্লাদিমির পুতিন বলেন তিনি যে এখনও জো বাইডেনকে অভিনন্দন জানাননি তার পেছনে কোনো ‘গোপন ষড়যন্ত্র‘ নেই।

তিনি বলেন, নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আমেরিকায় যে “অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব চলছে“ তার সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করতে চান।

রাশিয়ার রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া রিয়া নভোস্কি মি. পুতিনকে উদ্ধৃত করে বলছে, “এর (অভিনন্দন না জানানোর) পেছনে এমন কোনো ষড়যন্ত্র নেই যে আমরা অমুককে পছন্দ করি আর তমুককে অপছন্দ করি।“ তিনি বলেন, নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আইনি লড়াই শেষ হওয়ার পর বিজয়ীকে তিনি অবশ্যই অভিনন্দন জানাবেন।

ট্রাম্পের সাথে ব্যক্তিগত পর্যায়ে একটি উষ্ণ সম্পর্ক ছিল পুতিনের

তবে জো বাইডেনকে অভিনন্দন পাঠানোর ইস্যুতে তার টিভি সাক্ষাৎকারে মি. পুতিন আমেরিকার সাথে রাশিয়ার সম্পর্কের চলতি সঙ্কট নিয়ে কড়া কিছু মন্তব্য করেছেন।

তিনি বলেন, দ্রুত অভিনন্দন পাঠানো বা না পাঠানোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া সম্পর্ক নির্ভর করে না।

“নষ্ট সম্পর্ক নতুন করে নষ্ট হয় না। সম্পর্ক ইতিমধ্যেই নষ্ট।“

আমেরিকার নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে চলমান অন্তর্কলহ নিয়ে টিপ্পনী কাটতেও ছাড়েন নি মি. পুতিন।

তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন পদ্ধতির মধ্যে অনেক গলদ রয়েছে, সুতরাং অন্য দেশের গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়ার সমালোচনা করার কোনো অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের নেই।”

পুতিনের বাইডেন সমস্যা

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কে হবেন বা না হবেন তাতে রাশিয়ার কোনো মাথাব্যথা নেই বলে যে বার্তা মি পুতিন রোববার দিতে চেয়েছেন, তার পেছনে কতটা সত্যতা রয়েছে তা নিয়ে অনেক পর্যবেক্ষকের মনে সন্দেহ রয়েছে।

মস্কোতে বিবিসির একজন সংবাদদাতা বলছেন, জো বাইডেনকে অভিনন্দন জানানো নিয়ে গড়িমসির অন্যতম প্রধান কারণ হয়তো নির্বাচনের ফলাফল মি. পুতিনের মনঃপুত হয়নি।অধিকাংশ পশ্চিমা বিশ্লেষকের ধারণাও সেরকমই।

লন্ডনের ফাইনানসিয়াল টাইমসের প্রধান রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফিলিপ স্টিভেন লিখেছেন হোয়াইট হাউজ থেকে ট্রাম্পের বিদায় ক্রেমলিনের জন্য যে উদ্বেগের কারণ তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। “ট্রাম্প ছিলেন পুতিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একজন প্রশংসাকারী।“

এটা ঠিক যে ২০১৬ সালের পরও মস্কো-ওয়াশিংটন সম্পর্কে তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। বরঞ্চ ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার ওপর কয়েক দফায় নতুন নতুন নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছে। অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণে চুক্তি নবায়নে অনীহা দেখিয়েছে।

কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে পুতিনকে নিয়ে সরাসরি কখনই কোনো বিরূপ মন্তব্য ট্রাম্প করেননি। বদলে একাধিকবার তিনি পুতিনের ‘বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের‘ প্রশংসা করেছেন।

২০১১ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসাবে তার মস্কো সফরের সময় তৎকালীন রুশ প্রেসিডেন্ট মেদভিয়েভের সাথে জো বাইডেন

‘দুর্বৃত্ত পুতিন’

অন্যদিকে জো বাইডেন পুতিনকে একবারেই যে পছন্দ করেন না তার ইঙ্গিত গত ১০ বছরে তার কথা-বার্তায় বারবার প্রকাশ পেয়েছে। পাশাপাশি, ২০১৬ সালের নির্বাচনে রাশিয়ার কথিত হস্তক্ষেপের পর ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে পুতিন বিরোধিতা চরম আকার নিয়েছে।

এবছরের মার্চ মাসে ওয়াশিংটন-ভিত্তিক একটি সাময়িকীতে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় ভ্লাদিমির পুতিনকে তিনি থাগ বা দুর্বৃত্ত বলে মন্তব্য করেন।

ঐ সাক্ষাতকারে রাশিয়ার সাথে পারমাণবিক অস্ত্র সীমিতকরণ চুক্তি প্রসঙ্গে জো বাইডেন বলেন, “নতুন স্টার্ট চুক্তি করতে আমি সাহায্য করেছিলাম। আমি তা করেছিলাম এজন্য নয় যে আমি পুতিনকে পছন্দ করি। মানুষটি একটি দুর্বৃত্ত।“

জুনের ২৭ তারিখে মার্কিন টিভি নেটওয়ার্ক এনবিসিতে মি. বাইডেন বলেন, “ভ্লাদিমির পুতিন এবং ক্রেমলিনের নীচতার কোনো শেষ নেই। “

এসব কথা পুতিনের মত ইগো-সম্পন্ন বা দাম্ভিক একজন মানুষ যে একবারেই পছন্দ করছেন না তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

ক্রাইমিয়া দখল এবং ইউক্রেনে সামরিক হস্তক্ষেপের সময় জো বাইডেন ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট। রাশিয়ার বিরুদ্ধে সে সময় কঠোর সব নিষেধাজ্ঞা চাপানোর মূলে ছিলেন তিনি।

নির্বাচনী প্রচারণার সময় সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মি. বাইডেন বার বার বলেছেন, “আন্তর্জাতিক রীতি-নীতি লঙ্ঘন“ করে পুতিনের রাশিয়া যাতে পার না পেতে পারে তা নিশ্চিত করতে তিনি বদ্ধপরিকর। রাশিয়ায় “পুতিনের স্বৈরাচারী” শাসনের বিরোধিতা যারা করছেন তাদের সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।

জো বাইডেন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন পশ্চিমা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোকে দুর্বল করে ফেলা, তাদের ঐক্য নষ্ট করা ভ্লাদিমির পুতিনের প্রধান একটি লক্ষ্য।

২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে লন্ডনে গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাটাম হাউজে এক বক্তৃতায় জো বাইডেন পরিষ্কার ভাষায় বলেছিলেন, “পুতিনের আসল ইচ্ছা নেটো জোট এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভাঙ্গন। জোটবদ্ধ একটি ইউরোপের বদলে মি. পুতিন আলাদা আলাদাভাবে ইউরোপের দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক করতে চান যাতে তাদের ওপর খবরদারি করা সহজ হয়।“

ফাইনানসিয়াল টাইমসের ফিলিপ স্টিভেন বলছেন, জো বাইডেনের বিজয়ে ইউরোপ এবং আমেরিকার কৌশলগত সম্পর্ক নতুন করে “অক্সিজেন পাবে।“ “আবার আটলান্টিকের দুই তীরের মধ্যে সহযোগিতা নিয়ে নতুন করে কথা শুরু হয়েছে। এবং সেই সহযোগিতার এজেন্ডার তালিকার ওপর থাকবে পুতিনের রাশিয়াকে সামলানো।“

তবে মার্কিন গবেষণা সংস্থা উইলসন সেন্টারের কেনান ইন্সটিটিউটের পরিচালক ম্যাথিউ রোজনস্কি সিএনএন-এ এক নিবন্ধে লিখেছেন, চাইলেই ভ্লাদিমির পুতিনকে এক হাত দেখে নেওয়া জো বাইডেনের কাছে সহজ হবে না। বাইডেনকে অনেকগুলো বাস্তব সমস্যার মোকাবেলা করতে হবে।

“ইউক্রেন, জর্জিয়া, সিরিয়া, লিবিয়ার পর এবং এখন আজারবাইজানেও রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। তাছাড়া, চীন-মার্কিন বৈরিতা যত বাড়বে চীনের সাথে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠতা তত বাড়বে যেটা জো বাইডেনের কৌশলগত সিদ্ধান্তে বড়রকম দ্বিধা তৈরি করবে।“

তিনি বলেন, মস্কো এবং বেইজিংয়ের মধ্যে দারুণ সখ্যতা না থাকলেও দুটো দেশেরই কৌশলগত লক্ষ্য অভিন্ন, “আর তা হলো বিশ্বে আমেরিকার কর্তৃত্ব খাটো করা।“