আমার প্রিয় মানুষ জয়ন্ত দাদা

Social Share

এ.এস.এম. সামছুল আরেফিন
সমন্বয়ক, ফ্রেন্ডস অফ বাংলাদেশ
(বাংলাদেশ কোয়র্ডিনেটিং চ্যাপ্টার)

হঠাৎ পাওয়া কিছু সংবাদ মানুষকে নির্বাক করে। ৩১শে আগষ্ট ২০২০, সকালে মোবাইল ফোনে সংবাদ পেলাম বাংলাদেশের অতিপ্রিয় একজন মানুষ ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি শ্রী প্রণব মুখার্জির অন্তর্ধানের সংবাদ। আর এই সংবাদটি জানিয়েছিলেন জয়ন্ত ঘোষ নিজেই। বিষয়টি খুব আকস্মিক ছিলনা। বেশ কিছুদিন যাবৎ তিনি অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। শ্রী প্রণব মুখার্জি মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তি সময়ে বাংলাদেশের একজন অকৃত্তিম বন্ধু ছিলেন। পারিবারিকভাবে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সাথে ছিল দীর্ঘ ঘনিষ্ঠতা। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হয়।
একইদিন বিকালে সংবাদ এল জয়ন্ত দাদা আর আমাদের মধ্যে নেই। “ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ” সংগঠনের ভারতের সমন্বয়ক তপশ্রী গুপ্তের কাছ থেকে সংবাদটি এল। আমার কাছে এটি শুধু আকস্মিক নয়, ছিল অনেকটা অবিশ্বাস্য। কিছুক্ষন আগে যার সাথে কথা হল এখন সেই মানুষটি আর আমাদের মাঝে নেই। ভাবতে অবাক লাগে। মাত্র কয়েকদিন আগে তার স্ত্রী বিয়োগের সংবাদটি জেনেছিলাম। অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তির বিষয়টি তিনি নিজেই জানিয়েছিলেন। কথা বার্তায় কিছুটা অসহায়ত্য অনুমান করেছিলাম। বছর পার হয়নি তার স্নেহের কন্যা সোমার মৃত্যু হয়েছিল। কেমন মানুষের জীবন এবং পথ চলা। সবকিছু মিলিয়ে জয়ন্ত ঘোষ নিজেই অনেকটা ভেঙ্গে পড়েছিলেন।
শুধু ভারতবর্ষ নয় বাংলাদেশের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে জয়ন্ত দাদা ছিলেন প্রিয় এবং পরিচিত একজন মানুষ। বাংলাদেশের অনেকের সাথে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। অতি অল্প সময়ে তিনি বাংলাদেশ ও ভারতের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনে এক নতুন মাত্রা সৃষ্টি করেছিলেন। সজ্জন এই মানুষটি যেন অজান্তেই সকলের আপন হয়ে উঠেছিলেন। তার আকস্মিক মৃত্যু সংবাদ সকলকে বিস্মিত করে।
২০১৬ সালের ২৫, ২৬, ২৭ ডিসেম্বর “নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের” আমন্ত্রনে সস্ত্রীক ব্যাঙ্গালোর অধিবেশনে যোগ দিয়েছিলাম। এই সময় জেনেছিলাম ”নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন” ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বসবাসকারী বাংলা ভাষাভাষী সদস্যদের সর্ববৃহৎ সংগঠন। এটি ভারতে “প্রবাসী বাঙ্গালীদের সংগঠন” হিসাবে অধিক পরিচিত। সংগঠনের বর্তমান সভাপতি মাননীয় সাংসদ প্রদীপ ভট্টাচার্য। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে জয়ন্ত ঘোষ আমন্ত্রন জানিয়েছিলেন। স্বাক্ষরিত আমন্ত্রন পত্রে নামের সাথে পরিচিতি হলেও বাস্তবে অধিবেশনের আগে কখনও দেখা হওয়ার সুযোগ হয়নি। অতি সজ্জন প্রাণবন্ত একজন মানুষ প্রথম দেখাতেই যেন আপন হয়ে উঠেছিলেন। মনে হয়েছিল যেন অনেক দিনের চেনা। তখন সমস্ত ব্যাঙ্গালোর জুড়ে ছিল একটি উৎসবের আয়োজন। ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে সংগঠনের সদস্যগণ এই সম্মেলনে যোগদানে এসেছেন। ভারতের রাষ্ট্রপতি শ্রী প্রণব মুখার্জি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। এটি ছিল একটি বিশেষ আকর্ষণ। শ্রী প্রণব মুখার্জী ১১ বছর এই সংগঠনের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে পরবর্তিতে সাংসদ শ্রী প্রদীপ ভট্টাচার্য সভাপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। শ্রী জয়ন্ত ঘোষ দীর্ঘ দিন শ্রী প্রণব মুখার্জীর সাথে এবং বর্তমান সভাপতি শ্রী প্রদীপ ভট্টাচার্যের সাথে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেও শ্রী প্রণব মুখার্জী এই সংগঠন থেকে দুরে সরে থাকেননি। তিনি সংগঠনের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। সমস্ত অনুষ্ঠান জুড়ে সাংগঠনিক ও পারস্পরিক সম্পর্কের একটি আন্তরিক অনুভূতি সর্বক্ষেত্রে দৃশ্যমান ছিল।
দীর্ঘদিন বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক উন্নয়ন নিয়ে কাজ করার সুবাদে অনুষ্ঠানে আমার পরিচিত অনেকেই ছিলেন। এরমধ্যে অনেকেই পরিবারিক এবং সাংগঠনিকভাবে জয়ন্ত ঘোষের অতি কাছের মানুষ। টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপের কর্ণধার সত্যম রায় চৌধুরী ব্যাঙ্গালোরে এই সম্মেলনের অন্যতম সহযোগী। শিক্ষা ও সংষ্কৃতি জগতে তার বিশাল বিচরণ। “ফেন্ডস অব বাংলাদেশ” সংগঠনের “ভারত চ্যাপ্টারের” তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট। প্রখ্যাত চলচিত্রকার গৌতম ঘোষ সভাপতি এবং তপশ্রী গুপ্ত এই সংগঠনের “ভারত চ্যাপ্টারের” মূল সমন্বয়ক। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতাকারী সংগঠন, ব্যক্তিবর্গ বা তাদের পরিবারের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষায় এই সংগঠন সচেষ্ট। বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণ ও সরকারের মধ্যে সেতুবন্ধনে এই সংগঠন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। শুরু থেকে মুল সংগঠন “ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ কোয়ার্ডেনেটিং চ্যাপ্টার” এর প্রধান সমন্বয়ক হিসাবে আমি দায়িত্ব পালন করে চলেছি।
ব্যাঙ্গালোরে অনুষ্ঠিত “নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন” উভয় দেশের মধ্যে সাহিত্য ও সংস্কৃতির যোগাযোগের আরো একটি নতুন অধ্যায়। ব্যাঙ্গালোরে এই সম্মেলনে আমার দুটি অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার সুযোগ হয়েছিল। পরিচয় হয়েছিল সাহিত্য জগতের অনেক গুনী ব্যক্তিদের সাথে। বিভিন্ন বিষয়ে অনেকের জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় নিজেকে সমৃদ্ধ করার সুযোগ হয়েছিল। জয়ন্ত ঘোষের কন্যা সোমা, তপশ্রী গুপ্ত আর কবি চৈতালী মুখোপাধ্যায় অনুষ্ঠানের পুরো সময়টিকে প্রাণবন্ত করে রেখেছিল। আমার মিসেসও সম্মেলনের দিনগুলিতে কোনভাবেই একলা বোধ করেনি। আর এই সবই সম্ভব হয়েছিল জয়ন্ত ঘোষ ও আয়োজকদের আন্তরিকতায়।
জয়ন্ত ঘোষ ব্যক্তি মানুষটিকে কাছ থেকে না দেখলে বোঝা যায়না। কাজের প্রতি তার একাগ্রতা, নিষ্ঠা, আলাপে আন্তরিকতা এবং সকলের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ব্যাঙ্গালোর অনুষ্ঠানের সময়কালে “প্রথম আর্ন্তজাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলনের” পরিকল্পনা হয়েছিল। ভারতের “নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন” এবং বাংলাদেশের “ফেন্ডস অব বাংলাদেশ” দু‘দেশের এই দুই সংগঠনের সমন্বয়ে এই সম্মেলন ঢাকাতে অনুষ্ঠিত হবে। কলকাতায় জয়ন্ত ঘোষ এবং সংগঠনের সভাপতির সাথে একাধিক বৈঠকের মধ্যদিয়ে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি শ্রী প্রণব মুখার্জিকে অনুষ্ঠানের সমাপনী দিনে যোগদানের বিষয়টি নিশ্চিত হয়। বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার সম্মতি দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের সামাজিক ও সাহিত্য জগতের সম্মানিত ব্যক্তি অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে সভাপতি এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দিন ইউসুফকে প্রধান সমন্বয়ক করে আয়োজক কমিটি গঠিত হয়। এই আয়োজক কমিটিতে উভয় দেশের সংগঠকগণ সমন্বিত ছিলেন। ২০১৬ সালের ১৩-১৫ জানুয়ারী ঢাকাতে বাংলাদেশ সরকারের সার্বিক সহযোগিতায় তিন দিনের এই সম্মেলন সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়। ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে ২০০-এর অধিক ডেলিগেট যোগদান করেছিলেন। দু‘দেশের শিল্পী সাহিত্যিকদের সমন্বয়ে আলোচনা ও সংগীতে ঢাকা ছিল উৎসবমুখর। ভারতের সম্মানিত অতিথিদের অনেকেই বাংলাদেশে প্রথমবার এসে তাদের পূর্ব পুরুষদের বাসস্থান, আত্মীয় বা পড়শীদের খবর নিয়েছেন। আবার মিলিত হয়েছেন অনেকের সাথে। এই মহামিলন দু‘দেশের মানুষের কাছে আজো উদাহরণ হয়ে আছে। জয়ন্ত ঘোষ এবং তার সংগঠনিক দল ভারত থেকে আগত যোগদানকারী সকল সদস্যদের নানাবিধ বিষয় বাংলাদেশের আয়োজকদের সাথে সমন্বয় করেছিলেন। অনুষ্ঠান আয়োজনের সহযোগিতায় জয়ন্ত ঘোষের সাংগঠনিক দক্ষতা সেদিন আমাদের মুগ্ধ করেছিল। বলা যায় দিনে দিনে সাংগঠনিক কর্মকান্ডের বাইরে আমাদের মধ্যে একটি পারিবারিক বন্ধন গড়ে উঠেছিল। সম্পর্কটি অজান্তেই আলাপে একসময় জয়ন্ত ঘোষ থেকে জয়ন্তদা এবং আরেফিন সাহেব থেকে আরেফিনদা তে পরিবর্তিত হয়। বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ তার ভলেনটিয়ার দল নিয়ে সমস্ত অনুষ্ঠান দক্ষতার সাথে সমন্বয় করেছিলেন। তার সহযোগিদের মধ্যে ছিল জয়ন্ত আচার্য, ওয়াসিম, জিহাদ, প্রমিত, তুষার, নাহিদসহ ৬০ জনের একটি দল। জয়ন্ত ঘোষের সাংগঠনিক সহযোগীদের মধ্যে কবি চৈতালী মুখোপাধ্যায়, তপশ্রী গুপ্ত, অর্জানী গুপ্ত এবং বৈশালীর নাম উল্লেখযোগ্য। টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপের কর্নধার সত্যম রায় চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি সাংস্কৃতিক দল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান থেকে সম্মেলনের সকল দিনগুলি আনন্দময় করে রেখেছিলেন। এই সম্মেলনেই নির্দিষ্ট হয়েছিল ২০২০ সালে “বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকীতে” ভারতে আয়োজিত হবে ২য় আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলন। আর এই সাহিত্য সম্মেলনে “বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ” থাকবে মূল প্রতিপাদ্য। সম্মেলনের এই সিদ্ধান্ত সকলকে উৎসাহিত করেছিল।
২০১৯ সালের মাঝামাঝি শুরু হয়েছিল “২য় আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলনের” আয়োজন। অনুষ্ঠিত হবে ঐতিহ্যবাহী দিল্লি কালী বাড়ী মন্দির চত্ত্বরে। সময় ঠিক হল ২০২০ সালের এপ্রিল মাসের ০৫ থেকে ০৭ তারিখে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানান হয়েছিল ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি শ্রী প্রণব মুখার্জী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। সামগ্রিক আয়োজনের মধ্যমনি জয়ন্ত ঘোষ। বছর জুড়ে ঢাকায় এবং কলকাতায় একাধিক মিটিং হয়েছে। টেলিফোনে চলেছে আয়োজন বিষয়ে আমাদের নানান আলোচনা। যখনই আমি কোন কাজে কলকাতায় গিয়েছি জয়ন্ত দাদা যেখানেই থাকুন চলে এসেছেন মত বিনিময়ের জন্য। একাধিকবার সংগঠনের সভাপতি সম্মানিত সাংসদ শ্রী প্রদীপ ভট্টাচার্যের সাথে অনুষ্ঠানের নানাবিধ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন। এই সম্মেলন প্রস্তুতিতেও জয়ন্ত ঘোষের সার্বক্ষনিক সাংগঠনিক সহযোগী হিসাবে দেখেছি কবি চৈতালী মুখোপাধ্যায় এবং তপশ্রী গুপ্তকে।
একসময় দিন গণনা প্রায় শেষ। ২রা-৩রা মার্চ দিল্লি কালী বাড়ী অনুষ্ঠানস্থলে অনুষ্ঠিত হল আয়োজন বিষয়ে সমাপনী আলোচনা। জয়ন্ত ঘোষের সাথে ছিলেন চৈতালী মুখোপাধ্যায়, তপশ্রী গুপ্ত এবং দিল্লি কালী বাড়ীর প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গ। আমার সহযোগী ছিলেন ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশের সদস্য প্রাক্তন সাংসদ জনাব হারুন অর রশীদ ও আমার স্ত্রী। চারিদিকে প্যান্ডেলসহ সাজানো গোছানোর কাজ চলছে। জয়ন্ত দাদা ঘুরে ঘুরে আমাদের ষ্টেজ, বইয়ের স্টল, খাবারের স্থান এবং বসার ব্যবস্থাসহ সকল আয়োজন দেখালেন। দিল্লির ঐতিহ্যবাহী এই মন্দির সকলের কাছে পূজনীয়। মন্দিরের লাইব্রেরিতে অনেক পুরোনো বইয়ের ভান্ডারের দেখা পেলাম। বাংলাদেশের লেখকদের বেশ কিছু বই আছে। মন্দিরের ব্যবস্থাপককে জানালাম সম্মেলনের সময় আমরা বাংলাদেশ থেকে বঙ্গবন্ধুর উপর লেখা শতাধিক বই মন্দিরের লাইব্রেরির জন্য নিয়ে আসব। সাথে সাথে তিনি একটা র‌্যাক দেখিয়ে জানালেন এটাই হবে লাইব্রেরির “বঙ্গবন্ধু কর্ণার” এবং সম্মেলনে বিষয়টি ঘোষিত হবে। জয়ন্ত দাদা আনন্দে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন।
দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলনের প্রথম দিনটি “বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নামে উৎসর্গিত” ছিল। বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকীতে বাংলাদেশের বাইরে এটাই ছিল প্রথম অনুষ্ঠান। জয়ন্ত ঘোষ সম্মেলন আয়োজক কমিটির কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করলে সকলেই একমত হয়ে সম্মতি দিয়েছিলেন। অনুষ্ঠান পরিকল্পনা এবং অঙ্গসজ্জাসহ অনুষ্ঠান সূচিতে সেভাবেই দু‘দেশের আলোচক নির্বাচিত হয়েছিল। কালীবাড়ী মন্দির থেকে হোটেলে ফিরে আমাদের নিয়মিত ট্রাভেল এজেন্টের মাধ্যমে হোটেল, গাড়ী এবং এয়ার টিকেটের সকল ব্যবস্থা সম্পন্ন করা হয়। ৮ই মার্চ অনুষ্ঠানের সার্বিক সমন্বয় বিষয়ে “ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশের” সহ সভাপতি সত্যম রায় চৌধুরী, দিল্লি কোয়র্ডিনেটর সৌম্য বন্দোপাধ্যায়, হারুন অর রশীদ, আমার স্ত্রী, আয়োজক কমিটির সভাপতি সাংসদ প্রদীপ ভট্টাচার্য এবং মহাসচিব জয়ন্ত ঘোষসহ দিল্লিতে সমন্বয়ক তপশ্রী গুপ্তর ভাই তাপস গুপ্তের বাসায় আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। খুঁটিনাটি বিষয়ে সমন্বয় ছিল মূল উদ্দেশ্য। তাপস গুপ্তের বাসার খাবার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটাই জয়ন্ত দাদার সাথে আমার শেষ দেখা। পরদিন ছিল আমাদের বাংলাদেশে ফেরার প্রস্তুতি।
এক মহামারী আমাদের সকল আয়োজনে বাধ সেধে দাঁড়াল। চিন, আমেরিকা এবং ইউরোপ জুড়ে জানুয়ারীতে কোভিড-১৯ এর মহামারী দেখা দিলেও ভারতীয় উপমহাদেশে এর প্রভাব পড়েছিল ফেব্রুয়ারীর শেষ বা মার্চ মাসের শুরুতে। একের পর এক দেশে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য লক ডাউন চলছে। মৃত্যুর হার বেড়ে চলেছে দিনে দিনে। প্রতিষেধক নেই। অজানা এই রোগের বিষয়ে সকল স্তরের মানুষের মধ্যে বেশ কিছুটা আতঙ্কবোধ কাজ করছিল কি হয় বা কি হবে। একের পর এক আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা তাদের ফ্লাইট বন্ধ ঘোষণা করছে। ১১ই মার্চ দিল্লি থেকে বাংলাদেশ বিমানে ঢাকা ফিরে এলাম। কোভিড-১৯ এর প্রভাব সীমিত রাখতে ১৩ মার্চ থেকে ভারতে লক ডাউন শুরু হল। ভারত জুড়ে স্থগিত হল সকল আন্তর্জাতিক ফ্লাইট। অনিশ্চিত হল “দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলন”। যেহেতু অংশগ্রহণকারী সকলের জন্য হোটেল বুকিং, এয়ার টিকিটসহ সকল প্রস্তুতি শেষ হয়েছিল। আয়োজকদের আশা ছিল করোনার প্রভাব একটু স্থিমিত হলে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে পারে। আমি এবং জয়ন্ত ঘোষ উভয়েই পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছিলাম। ভারত জুড়ে লক ডাউন আরো জোরদার হল। সম্মেলন স্থল দিল্লির অবস্থা দিন দিন অবনতির দিকে। বাংলাদেশেও তখন লক ডাউনের প্রস্তুতি চলছে। মার্চ মাসের শেষে পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর উভয় দেশের আয়োজকদের সম্মতিতে সম্মেলন অনুষ্ঠান স্থগিত করা হল। জয়ন্ত ঘোষ বেশী হতাশ হয়ে পড়েছিলেন।
বছর জুড়ে ঝাড়খন্ড, কলকাতা এবং দিল্লির মধ্যে দৌড়ঝাঁপ। বয়স তার কোন কর্মকান্ডে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। আমরা নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছি। তিনি সব বিষয়ে আপডেট শেয়ার করেছেন। কোন কোন দিন একাধিবার যোগাযোগ হয়েছে। প্রতিটি বিষয়ে ছিল তার সতর্ক দৃষ্টি। যেহেতু উদ্বোধনীর দিনটি বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নামে উৎসর্গিত ছিল, সেহেতু বাংলাদেশের আয়োজকদের পক্ষ থেকে আমার সতর্কতা ছিল বেশি। অনুষ্ঠান কার্যক্রমে আমাদের প্রয়োজনীয় অনুরোধ জয়ন্ত দাদা সাধ্যমত সমাধানের চেষ্টা করেছেন। কর্মের প্রতি তার একাগ্রতা সকলকে বিস্মিত করত। সময়ের কোন নির্দিষ্টতা বা গন্ডি ছিলনা। ক্লান্তি কোন সময় তাকে থমকে রাখতে পারেনি। সদালাপি সর্বদা হাসিমুখী এ মানুষটির সাথে না মিশলে ব্যক্তি জয়ন্ত ঘোষকে চেনা কষ্টকর। তিনি ছিলেন সকলের জন্য এক অনুপ্রেরণা ।
২২শে মার্চ ১৯৪৯ সালে জয়ন্ত ঘোষের জন্ম হয়েছিল ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যের বহরাগোড়া গ্রামে। বাংলার বাইরে জন্ম হলেও বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশের প্রতি তাঁর ছিল একান্ত ভালবাসা। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তাম্রলিপ্ত মহাবিদ্যালয়ে অধ্যায়ন করেন। ছাত্র জীবনেই বাংলা সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ ছিল অনেক। মহাবিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সংগঠনের নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় তিনি সাফল্যের ছাপ রেখেছিলেন। ঝাড়খন্ড রাজ্যে বাংলা ভাষাকে দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়ার আন্দোলনে তার অগ্রনী ভূমিকা ছিল। তিনি বাংলা, হিন্দি, ওড়িয়া এবং ইংরেজি ভাষায় পড়তে, বলতে ও লিখতে পারতেন। ছাত্র জীবন থেকে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক জগতে ছিল তার বিচরণ। ২১ বছর বয়সে স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার একজন কর্মকর্তা হিসাবে কর্মজগতে তার প্রবেশ। প্রাথমিক কর্মস্থল ছিল ওড়িশার রায়রংপুর। এলাকার লৌহ খনি শ্রমিকদের অধিকার আন্দোলনে তার সক্রিয় অংশ গ্রহণ ছিল। দীর্ঘদিনের এই কর্মজীবনে ব্যাংকের কর্মচারী ইউনিয়নে তিনি সফল নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৮৪ সালে নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন সংগঠনের কোডারমা শাখার কর্মাধ্যক্ষ পদে সংগঠনে তার যোগদান। ২০০৪ সালে নির্বাচিত হয়ে তিনি সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০০৯ সালে তিনি সংগঠনের সহ-সভাপতি পদে নির্বাচিত হন এবং পুনরায় ২০১০ সাল থেকে আমৃত্যু তিনি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে আসীন ছিলেন।
প্রয়াত রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির মতোই তিনি নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন সংগঠনের আর এক প্রাণ পুরুষ হয়ে ওঠেছিলেন। চার বছরের পরিচয় মেলামেশা তাকে অনেক বেশী জানার সুযোগ করে দিয়েছিল। তার বিনয়, শিক্ষা, কর্মদক্ষতা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। নিজের দেশের মত বাংলাদেশকেও তিনি প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছিলেন। সাহিত্য ও সংস্কৃতি মানুষের সাথে মানুষের, সংগঠনের সাথে সংগঠনের এবং দেশের সাথে দেশের মেলবন্ধন তৈরি করে এটাকে তিনি আন্তরিকভাবে অনুধাবন করেছিলেন। প্রায় প্রতি দিনই আমাদের মধ্যে কথা হত। বিষয় ছিল একটাই কিভাবে দু‘দেশের মধ্যে সৌহার্দ্য গড়ে তোলা যায়। বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক নিয়ে আমি ৩০ বছরের অধিক সময়ে সম্পর্কিত। উভয় দেশের সরকারী, আধা সরকারী, বেসরকারী এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে “ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ”। নিয়মিত অনুষ্ঠান এবং মত বিনিময়ের মধ্যদিয়ে সম্পর্ক দৃঢ় হয়েছে এবং বর্তমানেও তার কার্যক্রম চলছে। মুক্তিযুদ্ধ সময় থেকে ব্যক্তিগতভাবে অনেকের সাথে সম্পর্কিত থাকায় সাংগঠনিক যোগাযোগের বিষয়টি আমার কাছে বেশ কিছুটা সহজ ছিল। একইভাবে আমার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণায় ভারতের ব্যক্তি ও সংগঠনের সাথে দিনে দিনে হৃদ্যতা বেড়েছে।
জয়ন্ত ঘোষের সাথে পরিচিত হওয়ার পর থেকে যেন নতুন একটা কর্মক্ষেত্র আমাদের সামনে উন্মুক্ত হয়েছিল। নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন ও টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপের সমন্বয়ে ভারতে তিনি একটি সমন্বিত যোগসূত্র গড়ে তুলেছিলেন যা আমাদের মধ্যে সম্পর্কের নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলন, তৃতীয় বাংলাদেশ-ভারত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর এবং বন্ধুরাষ্ট্র ভারত কর্তৃক বাংলাদেশের স্বীকৃতির ৫০ বছর যৌথভাবে উদযাপন ঘিরে অনেক পরিকল্পনা ছিল। একই সাথে স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপন ঘিরে উভয় দেশের কবি ও সাহিত্যিকদের লেখা নিয়ে একটি যৌথ প্রকাশনার বিষয় ছিল। তার অবর্তমানে অনেককিছু যেন স্থিমিত হয়ে পড়েছে। এই প্রাণ পুরুষটি আজ আমাদের মধ্যে নেই। সকাল সন্ধ্যা শুভেচ্ছা বিনিময়, পারিবারিক সংবাদ আদান প্রদানের অভাব বিশেষভাবে তাড়িত করছে। কোথায় যেন একটা শুন্যতা। হয়ত এই শুন্যতা পুরণ হওয়ার নয়। জয়ন্ত ঘোষ আমাদের মধ্যে “আমাদের জয়ন্ত দাদা” হয়ে বিচরণ করবেন। আমরা যেমন একজন শুভাকাঙ্খী হারিয়েছি তেমনি বাংলাদেশ তার একজন অকৃত্তিম বন্ধুকে হারিয়েছে। আমরা তার আত্মার শান্তি কামনা করি।