আমার গর্ব : গৌরব ঐতিহ্য সংগ্রামের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ

914
গৌরব
Social Share

জয়ন্ত আচার্য:  নব্বইয়ের স্বৈরশাসক এরশাদ বিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাগত একজন ছাত্র হিসাবে গৌরব ঐতিহ্য সংগ্রামের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের মিছিলে শরিক হই । এখন প্রায় মনে পড়ে বিশ্ব বিদ্যালয়ের সেই উত্তপ্ত দিনগুলোর কথা। সেই দিন সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে ছাত্রলীগই রেখেছিল সব চেয়ে অগ্রনী ভূমিকা । স্বাধীনতার সংগ্রাম থেকে শুরু করে দেশের সকল গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল , উন্নয়নের আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া সংগঠন ছাত্রলীগই দেশের ছাত্র সমাজের নেতৃত্ব দিয়েছে। তাই তো ছাত্রলীগ আমার গর্বের সংগঠন।

 

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতীম, দেশের অন্যতম প্রাচীন এবং ঐতিহ্যবাহী, অধিকার আদায়ের রক্ষার ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের আজ প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বাঙালির রাখাল রাজা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘শিক্ষা শান্তি প্রগতি’ মানবীয় শ্লোগান দিয়ে গঠন করেন ১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারি। সংগঠনটি বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ গঠনের এক বছর আগেই গঠন করেন জাতির পিতা। প্রজ্ঞাবান জাতির পিতা জানতেন, অক্ষয় মহৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে হলে ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আর ঐক্যবদ্ধ ছাত্র সমাজই পারে মানবীয় দেশ গড়ে তুলতে। আর তাই বিশ্ববাসী দেখেছে ‘৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ‘৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ‘৫৮ সালের আয়ুব বিরোধী আন্দোলন, ‘৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ‘৬৬ সালের ছয় দফা বাস্তবায়ন ও ১১ দফা দাবি প্রণয়ন, ‘৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ‘৭০ সালের নির্বাচন, ‘৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কর্মীরাই ছিল অগ্রবতীর্ণ সৈনিক। জীবন দিয়েছে মানব অধিকার তরে। রক্ষা করেছে বাঙালি জাতির সম্মান ও অধিকার।

‘জাতির পিতার ক্ষুধা দারিদ্রমুক্ত, সাম্য-সমতা, অসাম্প্রদায়িক স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠনের জন্য এ ছাত্র সংগঠন অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। একাত্তরে জাতির পিতা যখন মহান মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিয়েছিলেন তখন জীবন বিপন্ন হতে পারে জেনেও ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ শ্লোগান দিয়ে এই ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরাই সর্বাগ্রে অতীতের ন্যায় রাজপথে বেরিয়ে আসেন।’

এ ছাত্র সংগঠনটি বাংলাদেশকে বিশ্ব মানচিত্রে স্থান করে দিতে জাতির পিতার ডাকে সাড়া দিয়ে ১৭ হাজার নেতাকর্মী বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছেন। বাংলাদেশের কোন সংগঠন সাংগঠনিকভাবে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয় নি।

একমাত্র ছাত্রলীগই বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি সভা কেন্দ্রের সাংগঠনিকভাবে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। এজন্য সেসভায় সভার এজান্ডা করে আলোচনার মাধ্যমে সাংগঠনিকভাবে যুদ্ধে যাবার সিদ্ধান্ত নেয় ছাত্রলীগ। সে সিদ্ধান্ত সংগঠনের রেজুলেশন আকারে পাশ করা হয় ওই সভায়। যা বাংলাদেশের কোন সংগঠন করে নি। কারণ অন্যান্য সংগঠনের নেতারা যুদ্ধ করেছেন ব্যক্তিগত জায়গা থেকে। ছাত্রলীগই সাংগঠনিকভাবে যুদ্ধে অংশ নেয়। সুতরাং বুকের তাজা রক্ত দিয়ে কেনা যে বাংলাদেশের মানচিত্রে বড় একটি অংশের দাবিদার এই ছাত্রলীগ।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কিছু বিপথগামী সেনা সদস্য জাতির পিতাকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে নেমে সর্বপ্রথম প্রতিবাদী মিছিল করেছে ছাত্রলীগ। পঁচাত্তর পরবর্তী মৃত্যু উপতক্যায় পরিণত হওয়া বাংলাদেশে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের আত্মদানের এই মিছিল কেবল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে। কিন্তু থেমে থাকে নি প্রতিরোধ। বঙ্গবন্ধু পরবর্তী বাংলাদেশে হত্যা ও ষড়যন্ত্র প্রতিরোধে বঙ্গবন্ধুর যোগ্য উত্তরসূরি, গণতন্ত্রের মানসকন্যা ক্ষুধা ও দারিদ্র মুক্ত ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা বিশ্ব মানবতার নেত্রী মাদার অব হিউম্যানিটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে প্রতিটি সংগ্রামেই তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।

এক এগারোর পরবর্তী চাপিয়ে দেওয়া অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধেও বাংলাদেশ ছাত্রলীগ প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। এ কারণে গণতন্ত্রের মানসকন্যা দেশরত্ম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলে থাকেন, বাংলাদেশের ইতিহাস মানেই ছাত্রলীগের ইতিহাস। যা বঙ্গবন্ধুও বলে গেছেন বারংবার। গণতান্ত্রিক ইতিহাসের অবৈধ উপায়ে ক্ষমতা দখলদারী স্বৈরশাসকদের হটাতেও এই ছাত্র সংগঠন জলপাই রঙের পোশাকী সামরিক জান্তাদের শক্ত হাতে জবাব দিয়েছে।

বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গৌরব উজ্জ্বল ঐতিহ্য রয়েছে এ ছাত্র সংগঠনের। থাকবেই না কেন? শান্তিকামী বিশ্বের অগ্রবর্তী সৈনিক বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া এ ছাত্র সংগঠন। কারণ এ ধরা জানে, মহৎ, সৎ এবং পরমসহিষ্ণু হৃদয়ের উদ্দেশ্যই থাকে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা এবং মানবতার কল্যাণ। এ বৃহৎ কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করতেও দরকার হয় অগণিত নিবেদিত কর্মীর। শুধু কর্মী হলেই চলে না এদেরকে সঠিকভাবে নেতৃত্ব দিতে হয়, দেখাতে হয় সঠিক পথ। ছাত্রলীগের সৃষ্টিকাল হতে শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা অত্যন্ত সফলতার সাথে তাদের এ মহান দায়িত্ব সম্পাদন করেছেন। হয়েছেন বাংলার ইতিহাসের নায়ক।

ছাত্রলীগ মানবতার কল্যাণে শিক্ষার্থীদের পাশে থেকে দেশের ৫০ লক্ষাধিক ছাত্রদের মহৎ নিয়ম শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে তাঁরা কাজ করে যাচ্ছেন। কারণ বিশ্বের শান্তির অগ্রদূত হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু যত মানবীয় নিয়ম নীতি রক্ষার বাহক হিসেবে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ গঠন করে গেছেন।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা আর দেশের যোগ্য প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে ছাত্রলীগ। একবিংশ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া এই ছাত্র সংগঠন অসহায় দুস্থদের পাশে বার বার দাঁড়িয়েছে। ফলে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ শুধু আওয়ামী চেতনা থেকে মানবতার চেতনার পথে পথে শান্তি আর মুক্তির বার্তা দিয়ে যাচ্ছেন নিরন্তর। মানবতার ডাকে এই ছাত্রসংগঠনের সদস্যরা নিজের রক্ত দিতে সর্বদা প্রস্তুত থাকার দৃশ্য একাধিকবার দেখেছে শান্তিকামী বিশ্ব। ২০১৩ সালের এপ্রিলে রানা প্লাজা ধসের সময় হাজার হাজার ব্যাগ রক্ত দিয়েছে এ মানবীয় সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
মানবতাবাদী দর্শন, রয়েছে ত্যাগের মহিমার রক্ত জড়ানোর ইতিহাস, অধিকার আদায়ের প্রাণ বিসর্জন দেওয়ার সুদীর্ঘ ইতিহাস। শুধু রক্ত দিয়েই প্রকৃতিক দুর্যোগের সময় ক্ষান্ত থাকে নি এ ছাত্র সংগঠন। তাঁরা অসহায় দুঃস্থ মানুষের পেটে অন্ন এবং বস্ত্রহীনে বস্ত্র তুলে দেওয়ার একাধিকবার বিরল নজীর স্থাপন করেছে।

২০১৫ সালের এপ্রিলে নেপাল যখন ভয়াবহ ভূমিকম্পে মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হয় ছাত্রলীগের তখনকার মানবীয় দায়িত্ব ভুলে যাওয়ার কথা নয়। নেপালবাসীর চরম দুর্দিনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ডাকে সাড়া দিয়ে নেপাল বাসীর পাশে দাঁড়িয়েছে ছাত্রলীগ। ‘ওয়ার্ল্ড ওয়াইড নেপালিজ স্টুডেন্ট অর্গানাইজেশন বাংলাদেশ’ এর হাতে নগদ ছয় লাখ টাকা তুলে দেন সংগঠনটির তৎকালীন নেতারা। পাশাপাশি ছাত্রলীগ মৃত্যুপুরী নেপাল বাসীর জন্য দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে ঘুরে তহবিল সংগ্রহ করেছে। তহবিল সুষ্ঠভাবে নেপাল বাসীরকাছে দেওয়ার মত মহৎকাজ করেছে এ সংগঠন। দেশরত্ন শেখ হাসিনার অন্যতম সফলতা ছিটমহল সমস্যার সমাধান, সেই বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোতে পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষায় ৫০০০০ গাছ লাগায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। চলমান করোনাকালীন সময় দেশবাসীর পাশে জীবন রক্ষার বিভিন্ন উপাদান নিয়ে সাহসীকতার সাথে দাড়িয়েছে ছাত্রলীগ। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেথ হাসিনার উন্নয়নে ধারাকে এগিয়ে নিতে ছাত্রলীগ রয়েছে জাগ্রত।

আমি মনে করি যারা ছাত্রলীগের আদর্শ বিশ্বাসী হয়ে এ সংগঠনটি করে, তারা কথনই সাম্প্রদায়িত – ধর্মান্ধ হতে পারে না ।সংগঠনটিকে অর্থ উপার্জনের মেশিনের পরিনত করতে পারে না। তবে প্রায় গণমাধ্যমে ছাত্রলীগ কিছু কর্মীকে নেতিবাচক সংবাদ পরিবেশিত হয় । প্রশ্ন ওঠে কমিটি গঠন নিয়ে। সম্মেলন ছাড়া প্রেস রিলিসে কমিটি হয়ে যাবার। আমি মনে এসব ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের নেতৃত্বের একক দোষ দিয়ে লাভ নেই । কার্যত ছাত্রলীগ কি করবে , কিভাবে চলবে তার কোন গাইড লাইন নেই আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারনী মহল থেকে। নেই হাজার বছরের বাঙ্গালীর সংগ্রামী ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ ও ছাত্রলীগের আদর্শ -উদ্দেশ্য নিয়ে কোন কর্মশালা । বছরব্যাপী কার্যক্রমের কোন নে্ই ক্যালেন্ডার । তাই ছাত্রলীগকে অনেকে টেন্ডারবাজি -চাদা তোলা, পদ বেচার সংগঠনে পরিনত করার চেষ্টা করছে । এসব তথাতথিত ছাত্রলীগ নেতা কর্মীর জন্য ঐতিহ্যের এ সংগঠনের কলঙ্ক লাড়ছে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে দৃঢ়তার সাথে এগিয়ে যেতে হবে ছাত্রলীগকে । ছাত্রলীগের ইতিহাস মানে বাংলাদেশের ই্তিহাস- বাঙ্গালীর সাফল্যের ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতে গড়া ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ নিজ মহিমায় ভাস্বর হয়ে থাকবে, দীপ্তি ছড়াবে যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী। ছাত্রলীগের একজন সাবেক কর্মী হিসাবে এ প্রত্যাশা ।

লেখক: সম্পাদক, ভিনিউজবিডিডটকম; সদস্য, কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি বিষয়ক উপ কমিটি ও সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা