আফগানিস্তান প্রশ্নে জাতিসংঘে ভারতের কূটনৈতিক জয়

46
Social Share

লক্ষ্মী পুরী: জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি হিসেবে কাজ করতে গিয়ে ভারত একটি ‘স্মরণীয় আগস্ট প্রেসিডেন্সি’র ইতিহাস গড়েছে। ২০১১ সালের আগস্টে লিবিয়ার ঘটনাবলি যখন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে সে সময়টায় নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতিত্বে ছিল ভারত। ঠিক ১০ বছর পর আফগানিস্তানে ভৌগোলিক-রাজনৈতিক প্রবল ঝাঁকুনি ঘটে গেল আগস্টে এবং নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতিত্ব করছে ভারত। ঝাঁকুনিটা সভাপতিত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছিল আর দেখা দিয়েছিল পরীক্ষা হয়ে।

সে পরীক্ষায় চমৎকার নৈপুণ্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয় ভারত। শান্ত-স্থির চিত্তে ভারত নিজের সুরক্ষা আর জাতীয় স্বার্থের অগ্রযাত্রা এবং বিশ্ববাসীর কল্যাণ, সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ, শান্তি ও নিরাপত্তা বিধানের ওপর গুরুত্বারোপ করে। ২০২১ সালের প্রেসিডেন্সির আলাদা বৈশিষ্ট্যও লক্ষণীয়। এবারই প্রথমবারের  মতো ভারত সরকারের সর্বোচ্চ ব্যক্তি, দেশের নেতা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সভাপতির আসন গ্রহণ করেছেন। এতে করে তিনি গড়লেন ইতিহাস। সভাপতি নরেন্দ্র মোদি তাঁর ভাষণে ফুটিয়ে তুলেছিলেন নিরাপত্তা পরিষদে যাদের প্রতিনিধিত্ব নেই সেসব দেশ ও জাতির কণ্ঠস্বর। তিনি বিশ্বময় অনুভূত উদ্বেগের বিষয় ‘সামুদ্রিক নিরাপত্তা’র জন্য সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। পরিষদে ভারতের সভাপতিত্বে এ পর্যন্ত ১৪টি প্রস্তাব অনুমোদন পায়। আকার নেয় পাঁচটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব। প্রস্তাবগুলো গ্রহণ করা হয় আফগানিস্তান, সোমালিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, মালি ও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর পরিস্থিতির ওপর। ‘সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের কারণে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতি সৃষ্ট হুমকি’ শীর্ষক এক আলোচনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শংকর। এ অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ নিরসনে জাতিসংঘের বৈশ্বিক কৌশল জোরদার করতে ভারতের আট দফা পরিকল্পনা প্রশংসিত হয়। মিয়ানমার, মালি, সোমালিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ইথিওপিয়া, হাইতি ও উত্তর কোরিয়া ইস্যুতে ভারতের পরামর্শক-ক্ষমতার সামর্থ্য অজানা নয়। যেটা চমকপ্রদ হয়ে ওঠে সেটা হলো আফগানিস্তানের ঘটনাবলির সামনে ভারতের বিচক্ষণতা ও দ্রুতগতির কার্যব্যবস্থা। এসব কার্যব্যবস্থার মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যময় হচ্ছে ৩০ আগস্ট গৃহীত নিরাপত্তা পরিষদের ২৫৯৩ নম্বর প্রস্তাব। তালেবান শাসন ফিরে আসার পর আফগানিস্তানে সন্ত্রাসবাদের পুনর্জাগরণ সম্পর্কে হুঁশিয়ারি রয়েছে এখানে। এতে বলা হয়, আফগানিস্তান থেকে কোনো দেশে সন্ত্রাসী হামলা চালাতে দেওয়া বা সে দেশে সন্ত্রাসীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। ১২৬৭ নম্বর প্রস্তাবে লস্কর-ই-তৈয়বা, জইশ-ই-মোহাম্মদসহ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নেওয়ার যে আহ্বান জানানো হয়েছিল তার পুনরুল্লেখ ছিল ২৫৯৩ নম্বর প্রস্তাবে। প্রস্তাবে তালেবানকে নারী-শিশু-আফগানি হিন্দু, শিখসহ সব মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য বলেছে, তারা ২৫৯৩ নম্বর প্রস্তাবের ভিত্তিতে তালেবান সরকার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবে। দেখবে ওরা প্রস্তাবটির কতটা বাস্তবায়ন করে। চীন ও রাশিয়া নিজেদের তালেবানের দরদি হিসেবে উপস্থাপন করে; তারা প্রস্তাবটি সমর্থনে অস্বীকৃতি জানায়। তবে দুটি দেশকেই বিরত থাকতে বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাজি করায় ভারত। তাই তারা তাদের ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করেনি। এটা এক তাৎপর্যময় কূটনৈতিক জয়।

লেখক : জাতিসংঘের সাবেক সহকারী মহাসচিব। ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এ প্রকাশিত ‘আউইন অ্যাট ইউএন হাইটেবল’ নিবন্ধের ভাবানুবাদ।