আদর্শ রাজনীতির ঠিকানা বঙ্গবন্ধু

564
Social Share

ডাঃ কামরুল হাসান খান: 

যুগ যুগ ধরে দেশে দেশে অনেক মনীষী এসেছেন যারা পৃথিবীকে বদলে দিয়েছেন-বদলে দিয়েছেন মানুষের জীবন-সমাজ। এসেছে নতুন নতুন তত্ত্ব, নতুন নতুন ধর্ম। সব মহামানবদের লক্ষ্য ছিল মানুষের কল্যাণ, পৃথিবীর শান্তি। ভারতবর্ষেরও রয়েছে স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘ আন্দোলন, সংগ্রাম আর ত্যাগের ইতিহাস। আমাদের অনেক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ভারতের স্বাধীনতা এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী, শেরে বাংলা, মওলানা ভাসানী, আবুল হাসিম, চৌধুরী খালেকুজ্জামান, তরুণ নেতা শেখ মুজিব প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীতে আরও অনেক নেতার জন্ম হয়েছে যেমন মণি সিং, মোজাফফর আহমদ প্রমুখ। সবারই উদ্দেশ্য ছিল দেশ এবং দেশের মানুষের কল্যাণ। ইতোমধ্যে পৃথিবীতে নানা রাজনৈতিক তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা পেয়েছে-গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, সশস্ত্র বিপ্লব। কোথাও কোথাও সামরিক অভ্যুত্থান। এদের মধ্যে তরুণ নেতা শেখ মুজিব গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্য নিয়ে এ বাংলায় রাজনীতি শুরু করলেন। তিনি স্বপ্ন দেখলেন এবং দেশের মানুষকে দেখালেন- বাংলার স্বাধীনতা। নির্ভীক, নির্মোহ, পরিশ্রমী শেখ মুজিব হাঁটলেন কণ্টকাকীর্ণ পথে জীবনের সকল যুক্তি নিয়ে, ব্যক্তিগত জীবন উপেক্ষা করে। কোন প্রলোভন, ক্ষমতার আকাক্সক্ষা তাঁকে জনগণ থেকে, লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। হয়ে উঠলেন বঙ্গবন্ধু, বাঙালীর আস্থার ঠিকানা।

যুগ যুগ ধরে পরিচালিত মুক্তি-সংগ্রাম, রাজনৈতিক কর্মকা-, বিভিন্ন নেতার আদর্শ ও দর্শন শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জীবন ও চিন্তা-ভাবনাকে প্রভাবিত করেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কৃতিত্ব একটি ভাষাভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পৃথিবীর ইতিহাসে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছেন- যেমন ইতালিতে ম্যাটসিনি ও গ্যারিবল্ডি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ওয়াশিংটন, ভারতে মহাত্মা গান্ধী, বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু প্রমুখ বিশে^র ইতিহাসে মহান নায়ক।

সাম্প্রদায়িক সমস্যা সমাধানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব দূরদৃষ্টির অধিকারী ছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তিনি অসাম্প্রদায়িক একটি গণসংগঠন গড়ে তোলার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দিয়ে কোন সংগঠন মুসলিম ছাত্ররা মেনে নিতে পারবে না এ কথা উপলব্ধি করে শেখ মুজিব বললেন, সংগঠনের নাম হবে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, তবে আমাদের কাজের ধারা হবে অসাম্প্রদায়িক। এভাবেই মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে এদেশের তরুণ রাজনীতিক এবং হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী- আবুল হাশিম গ্রুপের মুসলিম লীগ সদস্যদের নিয়ে গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ এবং ১৯৫৫ সালে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ একটি অসাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠে। শেখ মুজিব এ রূপান্তর করার বিষয়ে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনে তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিব সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এরপর ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ সংগঠনকে শক্তিশালী করার জন্য তরুণ যুব নেতা শেখ মুজিব কঠোর পরিশ্রম করেন। দলটি তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার কারণে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। ‘মনের ওপর জবরদস্তি করা চলে না’-এ কথাটা শেখ মুজিব বলতেন এবং বিশ^াস করতেন। তিনি কাজের ক্ষেত্রে রোমান্টিকতাকে প্রশ্রয় না দিলেও তাঁর হৃদয় ছিল রোমান্টিক। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল বাঙালীকে প্রকৃতির রূপ- রস সম্পর্কে সচেতন করে তোলেন। বাংলার রূপ- প্রকৃতি, শ্যামল গাছপালা, মাঠে মাঠে সোনার ধান আর গ্রামের শান্তস্নিগ্ধ জীবন শেখ মুজিবকে এদেশের মাটি ও মানুষকে নিবিড়ভাবে ভালবাসতে শিখিয়েছে। নদীর ¯্রােত, দিগন্ত- বিস্তৃত মাঠ তাঁকে বাংলার মানুষকে ভালবাসার দীক্ষা দিয়েছে। একই সঙ্গে বাংলার চাষী, কামার, কুমার ও সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ তাঁকে বিচলিত করত। তাই তাঁর রাজনীতির লক্ষ্য ছিল দেশের অবহেলিত মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। এই কাজটি করতে চাওয়ায় বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বলা চলে- আড়ম্বরের উচ্চ কোলাহল কখনই তাঁর আত্মসম্মানকে স্পর্শ করতে পারেনি। তাঁর মতো পৌরুষ এবং তেজস্বিতা বাঙালী মধ্যবিত্ত সমাজে দুর্লভ।

অহযোগ আন্দোলনের সময় বঙ্গবন্ধু ১৯৭১-এর ২৩ মার্চ প্রতিরোধ দিবসে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে দেখা করতে যান। সেদিন গাড়িতে তিনি বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে গিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্টের মিলিটারি সেক্রেটারি তাঁকে বাধা দিতে উদ্যত হন এবং কিছু মন্তব্য করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কঠোর দৃষ্টির সামনে তিনি নিরস্ত হন, এই তেজস্বিতা তাঁকেই মানায়। প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে সাহস বিস্তৃত বক্ষপটের অধিকারী এ রকম মানুষ বিশেষ ছিল না। তিনি তাঁর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনে, আচার-আচরণে স্বাভাবিক বাঙালী চরিত্রের ক্ষুদ্রতার উর্ধে ছিলেন। মানুষের প্রতি ভালবাসা এবং একই সঙ্গে অজস্র মানুষের ভালবাসা তাঁকে এই চারিত্রিক দৃঢতার অধিকারী করেছে। তিনি নিজের শক্তি সম্পর্কে সচেতন, সঙ্কল্প সাধনে অটল ছিলেন। একজন খাঁটি মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন নিরহঙ্কারী, সহকর্মীদের সুবিধা-অসুবিধা সম্পর্কে সচেতন। তাঁর লক্ষ্য ছিল একটাই- পাকিস্তানের বাঙালীর মুক্তি এবং তাদের মানুষের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করা স্বসমাজে, স্বদেশে এবং বিদেশীদের চোখে। বাঙালীকে একটি আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জাতি হিসেবে গড়ে তোলা ছিল বঙ্গবন্ধুর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। রাজভয়, মৃৃত্যুভয়, লোকভয় কোন কিছুই তাঁকে সঙ্কল্পচ্যুত করতে পারেনি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন সম্পর্কে গবেষকগণ অনেক সময় বিস্ময়বোধ করেন- যিনি তাঁর রাজনীতি শুরু করেছেন তরুণ বয়সে মুসলিম লীগের সংস্পর্শে, তিনি কিভাবে সামন্তবাদী সমাজের চিন্তা-ভাবনা ও ভাবাদর্শ থেকে বেরিয়ে এলেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর ওপর কার প্রভাব বেশি ছিল এবং কেন ও কিভাবে দেশের রাজনীতি, সমাজনীতি ও দেশের মানুষ সম্পর্কে ভাবনা-চিন্তায় তাঁর নিজস্বতা গড়ে উঠল? শৈশবের বহু ঘটনায় সামাজিক পরিবেশের বহু প্রভাব মানুষের চরিত্র গঠনে সহায়ক হয় এবং শেষ দিন পর্যন্ত জীবনের সঙ্গী হয়ে থাকে। পারিবারিকভাবে তিনি পিতার স্নেহ প্রশ্রয় পেয়েছেন বাল্যকালেই। একবার এলাকার এক কৃষিজীবী মানুষ অজন্মর কারণে খাদ্যাভাবে কষ্ট পায়। শেখ মুজিব তাঁর ঘরের সঞ্চিত ধান-চাল তাদের মধ্যে বিতরণ করেন। এভাবে পরিবারের কাছ থেকেই তিনি মানুষকে ভালবাসার, দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা পেয়েছেন। তাঁর সহধর্মিণী বেগম ফজিলতুন্নেছা মুজিব অসাধারণ সহযোগিতা দিয়েছেন সারা জীবন। দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য তাঁকে কোন তত্ত্বের আশ্রয় নিতে হয়নি। ১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একই সময়ে মন্ত্রী ও দলের কোন সাংগঠনিক পদে একই ব্যক্তি থাকতে পারবেন না, এই নীতি অনুসরণ করে বঙ্গবন্ধু মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিয়ে দলের সাংগঠনিক কাজে আত্মনিয়োগ করেন।

বঙ্গবন্ধু রাজনীতিতে এসেছিলেন দেশের মানুষকে ভালবেসে। তাই ক্ষমতার লোভ, কিংবা যশ, খ্যাতি, সম্পদের মোহ তাঁকে লক্ষ্যচ্যুত করতে পারেনি। দেশ ভাগ হওয়ার পূর্বে ১৯৪২-৪৩ সালে শেখ মুজিব যখন ছাত্র রাজনীতি করতেন তখন তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয়তার কারণে ওই সময়ই তিনি নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগ ও নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্রলীগ ফেডারেশনের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। তাঁর মধ্যে ছিল নেতৃত্বের গুণাবলী সাহস ও সাংগঠনিক দক্ষতা। লক্ষ্য অর্জনে অবিচল। দেশের মানুষ এবং সর্বোপরি বাংলাদেশকে ভালবাসতেন বলে বিভাগ পূর্ব বাংলায় ৫০-এর মম্বন্তরের সময় কংগ্রেস, ফরোয়ার্ড ব্লক ও কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীদের সঙ্গে মুসলিম লীগের যুব কর্মীদের নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে তিনি দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ কমিটিতে যোগদান করেন। এ সময় দুর্গতদের মধ্যে সেবাকার্য পরিচালনায় শেখ মুজিবের অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য।

দেশ বিভাগের আগে ১৯৪৬ সালে কলকাতায় ১৬ আগস্ট ব্যাপক রক্তক্ষয়ী হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা শুরু হয়। যেখানে শেখ মুজিব জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়কে রক্ষার কাজে দিন-রাত ঝুঁকি নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করেছেন।

২৪ বছরের নিরসল সাধনায় সাফল্য অর্জন সত্ত্বে¡ও তিনি অহঙ্কারী ও উদ্ধত ছিলেন না। বিলাসিতা ও স্বেচ্ছাচারকে তিনি ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে কখনও প্রশ্রয় দেননি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও তাঁর ৩২ নম্বর ধানম-ির বাসাটি একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মতোই আড়ম্বরহীন, বাহুল্যবর্জিত, সাধারণ ছিল। পৃথিবীর কোন দেশের রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন এতটা সাধারণ, জাঁকজমকহীন এমন কল্পনা করা যায় না। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের অংশীদার হিসেবে তিনি অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন। তাঁর স্ত্রীও তাঁরই আদর্শের অনুসারী ছিলেন। বলা যেতে পারে তাঁর স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেছা একজন আদর্শ গৃহিণী হলেও প্রখর রাজনৈতিক চেতনাসম্পন্ন মহিলা ছিলেন। কোনরূপ দাম্ভিকতা, আড়ম্বরপ্রিয়তা ও অহঙ্কারকে মুজিব-দম্পতি প্রশ্রয় দেননি। বঙ্গবন্ধুর পক্ষেই নির্দ্বিধায় বলা সম্ভব হয়েছে সমগ্র দেশবাসীকে, এদেশের প্রতিটি বাঙালীকে, প্রতিটি মানুষকে- ‘আমি তোমাদেরই লোক।’ বিশ^কবির এ ঐকান্তিক ইচ্ছার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন দেখতে পাই বাঙালী জাতীয়তাবাদের জনক, বাংলাদেশের রূপকার, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনে।

দেশবাসীর ওপর তাঁর প্রভাব ছিল অতুলনীয়। বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ একদিন তাঁর কথায় অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে, প্রাণ দিয়েছে। কারণ তারা জানত এই মানুষটি দেশের মানুষের ভালবাসা ছাড়া আর কিছুই চান না। না পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রিত্ব, না প্রভুত্বের গৌরব, না ধনৈশ্বর্যের মূঢ়তার সাহচর্য। বাঙালীকে বিশ্বের দরবারে একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়ার গৌরব ব্যতীত তাঁর আর কোন স্বপ্ন ছিল না। বার বার জেলে নিয়ে নিগ্রহ করার পাশাপাশি তাঁকে হত্যার জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করা হয়েছে। আগরতলা মামলায় দেশদ্রোহী বলে তাঁর প্রাণনাশ করার চেষ্টা করেছিল পাকিস্তানের সামরিক জান্তা। রাওয়ালপিন্ডিতে আইয়ুবের সঙ্গে গোলটেবিল বৈঠকের প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার আরও একটি ষড়যন্ত্র হয়েছিল এপিপি প্রধান সৈয়দ মেয়াজ্জেম আলীর বাসায় নৈশভোজের মাধ্যমে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ বঙ্গবন্ধু ভারত সফরকালে কলকাতা প্যারেড গ্রাউন্ডে একজন সশস্র বাংলাদেশী নাগরিক ধরা পড়ে।

১৯৭১ এর ২৫ মার্চ কালরাত থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি পাকিস্তানের কারাগারে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে। একজন বিরাট মানবতাবাদী হিসেবে শেখ মুজিব বিংশ শতাব্দীর একজন শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রনায়ক।

বঙ্গবন্ধু আলজিরিয়ায় অনুষ্ঠিত জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘পৃথিবী দুই ভাগে বিভক্ত -শোষক ও শোষিত। আমি শোষিতদের পক্ষে।’ স্বাভাবিকভাবেই তিনি আন্তর্জাতিক শোষক চক্র পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের শিকার হয়েছিলেন। ধর্মকে রাজনৈতিক ব্যবসায়ে পরিণত না করে ধর্ম ও রাজনীতিকে আলাদা রাখার জন্য- ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিকে সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি করেছিলেন তিনি। এই উপমহাদেশে ধর্ম ও রাজনীতিকে পৃথকভাবে চর্চার তিনিই পথ প্রদর্শক। ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে নয়া আন্তর্জাতিক অর্থ-ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেন। উল্লেখ্য, তিনিই প্রথম রাষ্ট্রনায়ক যিনি জাতিসংঘে বাংলা ভাষায় বক্তৃতা করেন। একই ভাষণে বঙ্গবন্ধু বিশ^শান্তির সংগ্রামে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থানের কথা উল্লেখ করেন।

শেখ মুজিব একটি ঐতিহাসিক চরিত্র মাত্র নয়। মানুষের মুক্তি সংগ্রামে নির্ভীক নেত্বত্বের ক্ষেত্রে তাঁর অনন্য সাধারণ অবদান ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে। তাই ইতিহাস তাঁর কাছে ঋণী। বঙ্গবন্ধুর অকুতোভয় নেত্বত্বে অনেক রক্তের মূল্যে বাঙালী আজ মুক্ত। তাঁর ত্যাগ, বন্ধুত্ব ও নেতৃত্ব বাঙালীর অমূল্য সম্পদ। এ মহাসম্পদের কল্যাণে মুক্ত বাংলাদেশ অবশ্যই প্রগতির পথে এগোতে থাকবে। বাংলাদেশকে স্বাধীন করাই বঙ্গবন্ধুর একমাত্র কৃতিত্ব নয়। সাম্প্রদায়িকতার অন্ধ প্রকোষ্ঠ থেকে, শতাব্দী লালিত মূঢ়তা থেকে গণতন্ত্রের মুক্তির মন্ত্র শোনা গিয়েছিল তাঁর কণ্ঠে এবং তা বাস্তবায়ন করেছেন।

বঙ্গবন্ধু মৃত্যুঞ্জয় হয়ে আছেন বাংলাদেশের মানুষের ভালবাসায়। কোন কূটকৌশল বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলতে পারবে না, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর অবদান চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকবে। বঙ্গবন্ধুই বিশ্বের একমাত্র নেতা যিনি একটি জাতিকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছেন এবং স্বপ্নের বাস্তবায়ন করেছেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও রাজনীতি বিশ্লেষণ করলে তাঁর যে অন্যতম বৈশিষ্ট্যগুলো প্রাধান্য পায় তা হলো- সর্বোচ্চ ত্যাগ, প্রশ্নাতীত সততা, দেশ ও জনগণের প্রতি গভীর ভালবাসা, সাহস, মানবতাবাদী এবং লক্ষ্যে অবিচল।

বঙ্গবন্ধু বার বার বলেছেন সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই। আমরা অহরহ বলি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক। বঙ্গবন্ধুর কথা শুধু মুখে মুখে বললে হবে না তাঁর যে সোনালি আদর্শগুলো রয়েছে তা অনুসরণ করতে হবে, তাহলেই সোনার মানুষ হওয়া যাবে এবং কেবল তখনই বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে। আমরা যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী দাবি করিÑ এখন একটু মিলিয়ে দেখা দরকার এই মহান নেতার আদর্শের কতটা কাছে বা কতটা দূরে আছি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক দাবি করলে তাঁর ত্যাগ, সততা আর দেশপ্রেমের মহান আদর্শগুলো অনুসরণ করার চ্যালেঞ্জ তো আমাদের নিতেই হবে। কঠোরভাবে সুশাসন বাস্তবায়ন এবং দুর্নীতি দমন করার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

লেখক : সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়