আজ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ১২৫ তম জন্মদিন

36
Social Share

‘তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেবো।’- সুভাষচন্দ্র বসুর এ উক্তি থেকেই ঠাহর করা যায় কতটুকু তেজস্বী নেতা ছিলেন তিনি।
দেশজুড়ে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হচ্ছে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রবাদপুরুষ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ১২৫ তম জন্মজয়ন্তী। ভারতের মানুষের কাছে নেতাজি এক জীবনদর্শনের নাম। যার অন্তর্ধান আজও রহস্য ভারতের মানুষের কাছে। বীর নেতাকে শ্রদ্ধা জানাতে বিশেষ সম্মানের সঙ্গে দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে তাঁর জন্মবার্ষিকী।
গান্ধীজিও তাঁকে বলেছিলেন “প্যাট্রিয়ট অব প্যাট্রিয়টস”। যেভাবে মহান ব্যক্তিদের জন্মদিন পালন করা হয়, সেভাবেই পালন করা হোক নেতাজির জন্মদিন।
সুভাষচন্দ্র বসু, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক কিংবদন্তি নেতা। তিনি একবাক্যে নেতাজি নামে সমধিক পরিচিত।
আজ তার শুভ জন্মদিন। তিনি ১৮৯৭ সালের ২৩ জানুয়ারি বর্তমান ওড়িশা রাজ্যের কটক শহরে (ওড়িয়া বাজার) জন্মগ্রহণ করেন।
ব্রিটিশ ভাগাও আন্দোলনে সুভাষচন্দ্র ছিলেন মহাত্মাগান্ধীর বিপরীত মতাদর্শি।তিনি মনে করতেন গান্ধীজির অহিংসার নীতি ভারতের স্বাধীনতা আনার ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। এই কারণে তিনি সশস্ত্র বিদ্রোহের পক্ষপাতী ছিলেন।
সুভাষচন্দ্র মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তিনি কটকের স্টিওয়ার্ট স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। এরপর তাকে কটকের রর্যাভেনশ কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি করা হয়। ১৯১১ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় তিনি কলকাতা থেকে প্রথম স্থান অধিকার করেন । ১৯১৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বি.এ. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
এরপর সুভাষচন্দ্র কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজউইলিয়াম হলে উচ্চশিক্ষার্থে ভর্তি হন। সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় ভাল নম্বর পেয়ে তিনি প্রায় নিয়োগপত্র পেয়ে যান।
কিন্তু বিপ্লব-সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তিনি সেই নিয়োগ প্রত্যাখ্যান করেন। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘কোনো সরকারের সমাপ্তি ঘোষণা করার সর্বশ্রেষ্ঠ পন্থা হল তা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া।’
সুভাষচন্দ্র ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ হিন্দু। স্বামী বিবেকানন্দের ভাবাদর্শ তাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তার রাজনৈতিক গুরু ছিলেন বাংলায় উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ।
সুভাষচন্দ্র তার পুরো জীবনই ব্রিটিশ বিরোদী বিপ্লবে অতিবাহিত করেছেন। তিনি ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ নামক একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করে ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারতের পূর্ণ ও সত্বর স্বাধীনতার দাবি জানাতে থাকেন। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাকে এগারো বার কারারুদ্ধ করেছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পরেও তার বিপ্লবী মতাদর্শের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। বরং এই যুদ্ধকে ব্রিটিশদের দুর্বলতার সুবিধা আদায়ের একটি সুযোগ হিসেবে দেখেন তিনি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনালগ্নে ভারতে ব্রিটিশদের আক্রমণ করার জন্য সহযোগিতা লাভের উদ্দেশ্যে তিনি লুকিয়ে ভারত ত্যাগ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন, জার্মানি ও জাপান ভ্রমণ করেন ।
জাপানিদের সহযোগিতায় সুভাষচন্দ্র বসু ভারতীয় যুদ্ধবন্দী এবং ব্রিটিশ মালয়, সিঙ্গাপুরসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে কর্মরত মজুর ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’ পুনর্গঠন করেন। এ ফৌজের নেতৃত্বদান করে ব্রিটিশ মিত্রবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করেন।
সুভাষচন্দ্র পরপর দুইবার ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে আদর্শগত সংঘাত এবং কংগ্রেসের বৈদেশিক ও আভ্যন্তরিণ নীতির প্রকাশ্য সমালোচনা করার জন্য তাকে পদত্যাগ করতে হয়।
ভারতের সংস্কৃতি মন্ত্রকের জয়েন্ট সেক্রেটারি নিরুপমা কোটরু এক বিবৃতিতে আগেই জানান, ১২৫তম জন্মদিনে দেশের প্রতি নেতাজির অতুলনীয় অবদানের কথা স্মরণ করবে দেশবাসী। তাঁর নিস্বার্থ দেশসেবা ও অদম্য উৎসাহকে স্মান জানাতে কেন্দ্রীয় সরকারও প্রতি বছর ২৩ জানুয়ারি দিনটিকে ’পরাক্রম দিবস’ হিসেবে উদযাপন করবে।
এর আগে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ১২৫তম জন্মদিন পালনের জন্য উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে কেন্দ্রীয় সরকার। এই কমিটির মাথায় রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ৮৫ জনের ওই কমিটিতে রয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, মিঠুন চক্রবর্তী সহ ৩০ জন বিশিষ্ট বাঙালিও।
নেতাজীর মৃত্যু নিয়ে আজও রহস্যে ঘেরা। এই মহান নেতার মৃত্যু কখন হয়েছে, কবে হয়েছে, কিভাবে হয়েছে তা আদৌ কোন সন্ধান মেলেনি আজও। অনেকের ধারণা, ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট তাইওয়ানে একটি বিমান দুর্ঘটনায় সুবাষ চন্দ্রের মৃত্যু হয়। তবে তার এই তথাকথিত দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর বিরুদ্ধ প্রমাণও বিদ্যমান।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ১২৫ তম জন্মজয়ন্তীর মুখে নয়া ঘোষণা করল মোদী সরকার। এবার থেকে প্রতি বছর নেতাজির জন্মদিনকে ‘পরাক্রম দিবস’ হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নিল কেন্দ্র সরকার। এই সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেছে সংস্কৃতি মন্ত্রক।

এদিন কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রকের তরফে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে জানানো হয়েছে যে, স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে নেতাজির অবদানের কথা স্মরণ করে তাঁর জন্মদিনকে ‘পরাক্রম দিবস’ হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত সরকার।

নেতাজি জন্মজয়ন্তীকে যদি ‘দেশপ্রেম দিবস’ ঘোষণা করা হত, তাহলে আরও যুক্তিযুক্ত হত। তবে, আমরা এই ঘোষণায় খুশি, ২৩ জানুয়ারিকে ‘পরাক্রম দিবস’ হিসেবে কেন্দ্রের ঘোষণা প্রসঙ্গে বললেন নেতাজির প্রপৌত্র তথা BJP নেতা চন্দ্র বসু।
উল্লেখ্য, নেতাজির জন্মদিনকে জাতীয় ছুটি হিসেবে ঘোষণার দাবিতে বহুদিন ধরেই সরব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। ১২৫ তম জন্মজয়ন্তীর মুখে ফের এই দাবিতে সরব হয়েছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। সম্প্রতি এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে চিঠি লিখেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। প্রধানমন্ত্রী মোদী যাতে এ বিষয়ে নিজে থেকে উদ্যোগী হন, সে আর্জিও জানিয়েছেন মমতা।

এদিকে, নেতাজির ১২৫ তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে এবার ৮৫ সদস্যের কমিটি তৈরি করেছে কেন্দ্র সরকার। ওই কমিটিতে রয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, মিঠুন চক্রবর্তী, কাজল, নেতাজি গবেষক পূরবী রায়-সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। পাশাপাশি, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফেও একটি কমিটি তৈরি করা হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৈরি কমিটিতে রয়েছেন নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন, অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়, সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, কবি শঙ্খ ঘোষ-সহ প্রমুখ।

অন্যদিকে, স্বাধীনতার এত বছর পর আজও নেতাজির অন্তর্ধান রহস্যের কিনারা হল না। এখনও নেতাজি সংক্রান্ত গোপন ফাইল প্রকাশ হয়নি।