আওয়ামী লীগের ঘাটি নীলফামারী তে নৌকার ভরাডুবি নেপথ্যে : আমাদের বিশ্লেষণ (পর্ব ১)

4090
ভোটের উত্তাপ
Social Share

বিশেষ প্রতিবেদন –
উত্তরের ছোট্ট শহর নীলফামারী।ইতিহাসের পাতায় অনেক কিছুরই সাক্ষী এই জনপদ। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে শুধুমাত্র জলঢাকা উপজেলা ছাড়া বাকি ৫টি উপজেলাই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ঘাটি হিসেবে পরিচিত। এই নীলফামারীর ডোমার উপজেলার গোমনাতীতে বিএনপি চেয়াপারসন খালেদা জিয়ার ভাগিনা দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত পলাতক শাহরিন ইসলাম তুহিনের বাড়ি। অর্থাৎ খালেদা জিয়ার আপন বোন বিএনপির প্রেসিডিয়াম সদস্য সেলিমা রহমানের বাড়ি।বিগত জামায়াত -বিএনপি জোট সরকারের শাসনামলেও কিন্তু বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের এই ঘাটিতে কেউ ফাটল ধরাতে পারেনি।তৎকালীন দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী শাহরিন ইসলাম তুহিনের বিভিন্ন প্রলোভন, চাপ,হামলা -মামলাও টলাতে পারেনি মুজিব সেনাদের।সেই সময়ের উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি (বর্তমান সভাপতি) খায়রুল আলম বাবুল এর উপর র‍্যাব কে দিয়ে যে নির্যাতন চালানো হয়েছিলো, তার ব্যবসায় বন্ধ করে দেয়া হয়েছিলো তা সকলেরই জানা। তারপরও কিন্ত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তার কোন ঘাটতি এখানে ছিলো না,থাকবেও না বলে বিশ্বাস করেন অনেকেই।
আজ বাংলাদেশ আওয়ামী দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায়।বিএনপি এখন অস্তিত্ব সংকটে।তবুও সমগ্র জেলায় ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থীদের ভরাডুবি হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় এই যে,স্বাধীনতা উত্তর সময়ে জামায়াতের আতুরঘর হিসেবে পরিচিত জলঢাকা উপজেলার ফলাফল তুলনামূলক ভাবে ভালো(১০ এ ৬টিতে জিতেছে নৌকা)।
নীলফামারীর সৈয়দপুরে এক ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী মাত্র ৯৩ টি ভোট পেয়েছেন।
অনুরূপপভাবে,ডোমার উপজেলার কেতকীবাড়ী ইউনিয়ন এ নৌকার প্রার্থী পেয়েছেন সাকুল্যে ১৮৮ ভোট। এই উপজেলারই আরেক ইউনিয়ন ভোগিদাবুড়িতে নৌকায় ভোট পড়েছে ৫০০ এর মতো।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আতুরঘর খ্যাত এই অঞ্চলে নৌকার এমন ভরাডুবির কারণ খুজতে আমাদের অনুসন্ধানি দল কয়েকদিন ঘুরে বেড়িয়েছে প্রত্যেকটি ইউনিয়ন, অলিগলিতে।
মতামত নেয়া হয়েছে বিভিন্ন সাধারণ মানুষের, বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের। জানা যায়
নৌকার ভরাডুবির কিছু কারণ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তৃণমূল ত্যাগী নেতা থেকে জানা যায় যে, ত্যাগীরা মনোনয়ন পায়না,পায় হাইব্রিড নেতারা। যারা পদ-পদবীর জন্য রাজনীতি করেন।যারা মনোনয়ন পেয়েছেন তারা কোননা কোনভাবে উপজেলা নেতৃত্বের আস্তাভাজন হয়েই পেয়েছেন।
ডোমারের আওয়ামী লীগে এখন ফাটল দৃশ্যমান। প্রধান দুই নেতার বিবাদ এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে।
আক্ষেপ করে একজন উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা বলেন যে,আমাদের সভাপতি আর সেক্রেটারিতো কখনোই একে অপরকে কথা পর্যন্ত বলেন না।
সভাপতি সেক্রেটারির দ্বন্দ্বের কারণেই ডোমার পৌরসভার নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীকে তিন নাম্বার হতে হয়েছিলো।
উল্লেখ্য যে,ডোমার পৌরসভার নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী ছিলেন উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম আহবায়ক গণেশ কুমার আগরওয়ালা।
লোকমুখে প্রচলিত যে,গণেশ আগরওয়ালা সভাপতির লোক, তাই সেক্রেটারি তার হয়ে কাজ করেননি। কিন্তু উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তোফায়েল আহমেদ পৌরসভা নির্বাচনের কয়েকদিন আগে নৌকার জনসভা আয়োজন করলেও সেখানে প্রার্থী গণেশ কুমার আগরওয়ালা আসেননি। এই নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষোভ ছিল লক্ষনীয়।

ডোমার উপজেলার এক ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি থেকে জানা যায় যে, সভাপতির স্বাক্ষর ছাড়াই সহসভাপতিকে সভাপতি বানিয়ে কেন্দ্রে প্রার্থী তালিকা প্রেরণ করা হয়েছে।
এই অভিযোগের সত্যতা খুজতে অন্যান্য ইউনিয়নের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকদের সাথে আলাপ করলে ঠিক এরকম তথ্যই পাওয়া যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সভাপতি বলেন যে, উপজেলা নেতৃবৃন্দের যে চাপ,আমরা কি আর সেই চাপ সামলাতে পারি?

আরেক ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের একজন সদস্য হতে জানা যায় যে, প্রার্থী তো সিলেক্ট করে দেন উপজেলা নেতারা, আমাদের ইউনিয়ন নেতারা তো সেখানে স্বাক্ষর করেন শুধু।

ডোমারের কেতকিবাড়ী ইউনিয়ন এর এক ভোটার বলেন যে,”মুইতো নৌকাতে ভোট দিনু হয় বারে,কিন্ত নৌকার এক লোক আসি কছে এইটা বলে নকল নৌকা।এইঠে ভোট দেওয়া যাবে না “

নীলফামারীর সৈয়দপুরের এক ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতা মারফত পাওয়া তথ্য মতে,অনেক প্রার্থীই নাকি মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন পেয়েছেন। তারা ভেবেছিলেন যে,নৌকা পাইলেই পাশ। তাই তারা কোন ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাদের সাথে যোগাযোগ রাখেন নি।এমন কি ঠিকমতো ভোট চাইতেও যান নি।
নীলফামারিতে এবার বেশকিছু অজনপ্রিয় লোকজন মনোনয়ন পেয়েছেন বলে অনেকেই মনে করেন।
বিতর্কিতদের পক্ষে -বিপক্ষে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অকথ্য ভাষায় লেখালেখির কিছু স্ক্রিনশট আমাদের কাছে এসেছে। যারা এসব কাঁদা ছুড়াছুড়ি করেছেন তাদের বেশিরভাগই উপজেলা আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন আছেন অথবা গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন নেতাদের মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত।
ডিমলা উপজেলার ইউনিয়নের ফলাফল ও কিন্তু ভালো না।এই উপজেলার সন্তান সাংসদ আফতাব উদ্দিন সরকার। সাংসদের সাবেক ব্যক্তিগত সহকারী জহুরুল ইসলাম নৌকা নিয়েও হেরেছেন বিপুল ভোটের ব্যবধানে। ডিমলা উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের মাত্র ২টি জিতেছেন আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী।
জেলা আওয়ামী লীগের মধ্যে একটু ফাটল থাকলেও সাংসদ আসাদুজ্জামান নূরের শক্ত তদারকিতে বেশ মজবুত এখন জেলা আওয়ামী লীগ।(চলবে)…