আওয়ামী লীগের কাউন্সিলের পর ৬ সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি

ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগসহ যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, জাতীয় শ্রমিক লীগ ও কৃষক লীগের শীর্ষ ১২ নেতার বাসায় এখন উপচেপড়া ভিড়। এসব সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে পদ-পদবি পেতে আগ্রহী নেতাকর্মীরা প্রতিদিনই জড়ো হচ্ছেন নতুন এই নেতাদের বাসায়।

তবে আগামী ২০-২১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠেয় আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিলের আগে এই ছয় সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার সম্ভাবনা নেই। দলের কাউন্সিলের পর এসব সংগঠনের খসড়া তালিকা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর এগুলোর পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার প্রস্তুতি রয়েছে।

দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা বলছেন, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, শ্রমিক লীগ ও কৃষক লীগের বিদায়ী কমিটির নেতাদের মধ্যে কেউ কেউ মূল দলের কার্যনির্বাহী কমিটিতে স্থান পেতে পারেন। অনেকটা এ কারণেই আলোচিত ছয় সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের জন্য আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল পর্যন্ত অপেক্ষা করা হচ্ছে। যদিও কমিটি গঠনে দেরির কারণে পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে হতাশাও দেখা দিয়েছে।

শ্রমিক লীগ অবশ্য কমিটি গঠনের  কার্যক্রম শেষ করে এনেছে। তাদের খসড়া কমিটি আওয়ামী লীগ হাইকমান্ডের কাছে জমাও দেওয়া হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও কৃষক লীগের পদপ্রত্যাশীদের জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। যুবলীগেও জীবনবৃত্তান্ত নেওয়া হচ্ছে। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগের পদপ্রত্যাশীদের কাছ থেকেও জীবনবৃত্তান্ত নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে।

এসব সংগঠনের পদ-পদবিতে বিতর্কিত ও অনুপ্রবেশকারীরা যাতে আসতে না পারে সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কড়া সতর্কবার্তা রয়েছে। বিদায়ী কমিটির যেসব নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ও ক্যাসিনো সম্পৃক্ততাসহ নানা অপরাধমূলক কাজের অভিযোগ রয়েছে তাদের বাদ দেওয়ার প্রস্তুতিও রয়েছে। এ কারণে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের ক্ষেত্রেও কড়া সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে।

গত ৬ নভেম্বর কৃষক লীগ, ৯ নভেম্বর জাতীয় শ্রমিক লীগ ও ১৬ নভেম্বর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলন হয়েছে। যুবলীগের জাতীয় কংগ্রেস (সম্মেলন) হয়েছে ২৩ নভেম্বর। ৩০ নভেম্বর ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয়েছে।

এর আগে ক্যাসিনো, মাদক ও দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরুর পর আওয়ামী লীগের সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের পাশাপাশি মহানগরের অনেক নেতাই গ্রেপ্তার হন কিংবা আত্মগোপন করেন। অভিযুক্ত অনেক নেতাকেই সংগঠন থেকে বহিস্কার কিংবা অব্যাহতি দেওয়া হয়। এতে সংগঠনগুলোতে এক ধরনের স্থবিরতা ও ‘নেতৃত্বশূন্যতা’ দেখা দেয়। এ অবস্থায় সংগঠনগুলোতে গতিশীলতা আনতে দলের জাতীয় কাউন্সিলের আগেই মেয়াদোত্তীর্ণ সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ও মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

যুবলীগ: আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে যুবলীগের ওপরই ক্যাসিনো ও দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের প্রভাব বেশি পড়েছে। ক্যাসিনোকাণ্ড, মাদকসম্পৃক্ততা এবং দুর্নীতির অভিযোগে সংগঠনের কেন্দ্রীয় ও মহানগরের অনেক নেতাই গ্রেপ্তার, বহিস্কার অথবা আত্মগোপনে রয়েছেন। বিতর্কের মুখে সংগঠনের নতুন নেতৃত্বের বয়সসীমা ৫৫ বছর বেঁধে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এমন প্রেক্ষাপটে যুবলীগের কংগ্রেসে সংগঠনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেয়েছেন যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মনির ছেলে শেখ ফজলে শামস্‌ পরশ। সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন মাইনুল হোসেন খান নিখিল। দায়িত্ব নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের উদ্যোগও নিয়েছেন তারা। ৩৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে নভেম্বরের শেষভাগে ১৫ দিনের সময় বেঁধে দিয়ে আগ্রহীদের কাছ থেকে জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহের কাজ শুরু করা হয়েছে।

যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল বলেছেন, যুবলীগে স্বচ্ছ নেতৃত্ব আনার মধ্যে দিয়ে তারা হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। সেজন্য আগ্রহী নেতাদের জীবনবৃত্তান্ত খুব সূক্ষ্ণভাবে যাচাই-বাছাই করা হবে, যাতে বিতর্কিত কেউ ঢুকে পড়তে না পারেন। তবে আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিলের আগে যুবলীগের কমিটি ঘোষণার সম্ভাবনা অনেকটাই কম।

স্বেচ্ছাসেবক লীগ: স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলনে নতুন সভাপতি হন নির্মল রঞ্জন গুহ, সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান এ কে এম আফজালুর রহমান বাবু। তবে সম্মেলনের আগেই ক্যাসিনোকারণ সম্পাদক পংকজ দেবনাথকে। বিদায়ী কেন্দ্রীয় ও নগর কমিটির আরও অনেকের বিরুদ্ধেই একই অভিযোগ রয়েছে।

এ অবস্থায় সংগঠনকে বিতর্কমুক্ত করে ১৫১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের কাজ শুরু করেছেন সংগঠনের নতুন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে আসতে আগ্রহীদের কাছ থেকে জমা নেওয়া প্রায় ৫০০ জীবনবৃত্তান্ত যাচাই-বাছাই করে একটি ‘সংক্ষিপ্ত তালিকা’ও করা হয়েছে।

স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি নির্মল রঞ্জন গুহ বলেন, পরিচ্ছন্ন একটি কমিটি উপহার দিতে চান তারা। বিতর্কিত কাউকে নেতা বানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চলমান শুদ্ধি অভিযান প্রশ্নবিদ্ধ করতে চান না। এমন লক্ষ্য নিয়ে তাদের পূর্ণাঙ্গ কমিটির খসড়া তৈরির কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। দ্রুত খসড়া কমিটি করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দেওয়া হবে। তিনি অনুমোদন দিলে তা ঘোষণা করা হবে।

জাতীয় শ্রমিক লীগ: সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন যথাক্রমে ফজলুল হক মন্টু এবং কে এম আযম খসরু। কার্যকরী সভাপতি করা হয় মোল্লা আবুল কালাম আজাদকে। দায়িত্ব পাওয়ার কয়েক দিনের মাথায় সংগঠনের ৩৫ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির খসড়া তৈরি করে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক নেতাদের কাছে জমা দেন শ্রমিক লীগের নবনির্বাচিত নেতারা।

সাধারণ সম্পাদক কে এম আযম খসরু বলেন, সম্মেলনের চার-পাঁচ দিনের মাথায় নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে এবং স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন ইমেজের নেতাদের নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করেছেন তারা। এ কমিটি কেন্দ্রে জমাও দেওয়া হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিলের পরপরই প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন সাপেক্ষে এ কমিটি ঘোষণা করা হবে বলে তার ধারণা।

কৃষক লীগ: কৃষক লীগের সম্মেলনে কৃষিবিদ সমীর চন্দ সভাপতি ও অ্যাডভোকেট উম্মে কুলসুম স্মৃতি সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সম্মেলনের দু’দিনের মাথায় তিন সদস্যের ‘জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ উপ-কমিটি’ করে কৃষক লীগের ১১১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির বিভিন্ন পদে আসতে আগ্রহীদের জীবনবৃত্তান্ত আহ্বান করা হয়। জীবনবৃত্তান্ত জমা দিতে আগ্রহীদের তিন দিন সময় দেওয়া হয়েছিল।

কৃষক লীগের সভাপতি কৃষিবিদ সমীর চন্দ সমকালকে জানিয়েছেন, জমা পড়া ছয় শতাধিক জীবনবৃত্তান্ত যাচাই-বাছাই চলছে। শিগগিরই কমিটির খসড়া করে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য জমা দেবেন তারা। কেন্দ্রীয় কমিটিতে কৃষক ও কৃষিকাজে সম্পৃক্ত ত্যাগী ও যোগ্য নেতাদেরই জায়গা দেওয়া হবে। তৃণমূলের ত্যাগী এবং দক্ষ নেতাদেরও মূল্যায়ন করা হবে।