প্যারিসের পর, ভারতের জলবায়ূ উচ্চাকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি – হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা

28
Foreign Secretary Harsh Vardhan Shringla (File photo)
Social Share

প্যারিস চুক্তির পাঁচ বছর পর, ভারত সেই সব উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে রয়েছে, যারা কেবল তাদের “সবুজ” লক্ষ্যই পূরণ করে না বরং আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী জলবায়ু লক্ষ্য অর্জনে আগ্রহী।

সাম্প্রতিক জলবায়ু লক্ষ্য সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অবশ্যই আমাদের লক্ষ্য আরও উঁচুতে স্থির করতে হবে, কেননা আমরা আমাদের অতীতের দৃষ্টিভঙ্গিকে অগ্রাহ্য করতে পারি না। তিনি আরও যোগ করেছেন যে, ভারত কেবল প্যারিস চুক্তির লক্ষ্যই অর্জন করবে না বরং তাকে ছাড়িয়ে যাবে।

২০১৯ সালে জাতিসংঘ ক্লাইমেট অ্যাকশন সামিটে মোদী বলেছিলেন যে, এক টন প্রচারের চেয়ে এক আউন্স অনুশীলনের মূল্য বেশি। জলবায়ু কর্ম ও জলবায়ু লক্ষ্য সংক্রান্ত বিষয়ে নেতৃত্ব দিতে আমাদের সমাজের পুরো যাত্রায় আমরা জ্বালানী, শিল্প, পরিবহন, কৃষি এবং প্রাকৃতিক স্থানগুলির সুরক্ষাসহ সকল ক্ষেত্রে ব্যবহারিক পদক্ষেপ নিচ্ছি।

ভারত অনুধাবন করে যে, সাইলো’র ভেতরে থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য লড়াই করা যায় না। এর জন্য একটি সংহত, বিস্তৃত এবং সামগ্রিক পদ্ধতির প্রয়োজন। এর জন্য প্রয়োজন উদ্ভাবন, এবং নতুন ও টেকসই প্রযুক্তি গ্রহণ করা। এই অপরিহার্য বিষয়গুলি সম্পর্কে সচেতন হয়ে ভারত তার জাতীয় উন্নয়নমূলক এবং শিল্পকৌশলগত পরিকল্পনাগুলিতে জলবায়ুকে মূলধারায় রেখেছে।

সকল জলবায়ু কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে শক্তি। আমরা বিশ্বাস করি যে, ভারত একটি পরিচ্ছন্ন শক্তি উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে এবং আমরাকার্বন-ডাই-অক্সাইড উৎপাদনকারী উৎস থেকে পুনর্নবায়নযোগ্য এবং অ-জীবাশ্ম-জ্বালানী উৎসগুলিতে শক্তি রূপান্তরে নেতৃত্ব দিচ্ছি।

আমরা ভারতের পুনর্নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্ভাবনার সদ্ব্যবহারের লক্ষ্য রাখি। আমাদের পুনর্নবায়নযোগ্য শক্তি ক্ষমতা বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম এবং সক্ষমতা সম্প্রসারণের যে কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, সেটিও বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম। এর বেশিরভাগ অংশই আসবে সূর্য থেকে, যা সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন শক্তির উৎস।

আমরা ইতিমধ্যে অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি। আমরা প্রাথমিকভাবে ২০২২ সালের মধ্যে ১৭৫ গিগাওয়াট পুনর্নবায়নযোগ্য শক্তি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা আরও এগিয়ে গিয়ে, আগামী দুই বছরে ২২০ গিগাওয়াট পেরিয়ে যাওয়ার আশা করছি। আরও বেশি উচ্চাভিলাষী হয়ে, ২০৩০ এর মধ্যে আমাদের ৪৫০ গিগাওয়াট লক্ষ্য রয়েছে।

২০৩০ সালের মধ্যে ভারতে বিদ্যুৎ শক্তির ৪০% অ-জীবাশ্ম জ্বালানী উৎস থেকে উৎপাদন নিশ্চিত করার জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের অর্থনীতির নিঃসরণের তীব্রতাকে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৩-৩৫% হ্রাস করার লক্ষ্যে,২০০৫ সাল থেকে চলমান একটি সমান্তরাল প্রচেষ্টার সাথে এই পরিষ্কার শক্তির উদ্যম হাত মিলিয়ে চলেছে।

এলইডি বাতি ব্যবহারের জাতীয় অভিযান “উজালা প্রকল্প” প্রতিবছর কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হ্রাস করছে ৩৮.৫ মিলিয়ন টন। “উজ্জ্বলা প্রকল্প”, যার আওতায় ৮০ মিলিয়নেরও বেশি পরিবারকে পরিষ্কার রান্নার গ্যাসের সংযোগ সরবরাহ করা হয়েছে, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পরিষ্কার শক্তি উদ্যোগ।

জলবায়ু বিষয়ক কার্যক্রম ও স্থায়িত্বকে সরকারি পরিকল্পনার মধ্যে আনা হচ্ছে, যা একাধিক ক্ষেত্রজুড়ে বাস্তবায়নযোগ্য। ১০০টি শহরকে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জগুলির সাথে আরও টেকসই এবং অভিযোজিত হতে সহায়তা করার জন্য কাজ করছে আমাদের স্মার্ট সিটিস মিশন। আগামী চার বছরের মধ্যে বায়ু দূষণ (পিএম২.৫ এবং পিএম১০) ২০-৩০% হ্রাস করার লক্ষ্যে জাতীয় পরিচ্ছন্ন বায়ু কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়েছে।

জল জীবন অভিযান, যার লক্ষ্য ২০২৪ সালের মধ্যে গ্রামীণ ভারতের সমস্ত পরিবারে স্বতন্ত্র গৃহস্থালির কল সংযোগের মাধ্যমে নিরাপদ এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে পানীয় জল সরবরাহ করা, এর একটি দৃঢ় স্থায়িত্বের দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে।

আরও গাছ লাগানো হচ্ছে এবং একটি কার্বন “সিঙ্ক” তৈরি করতে পতিত জমিগুলো পুনরুদ্ধার করা হচ্ছে যা ২.৫-৩ বিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড শুষে নিতে পারে।

আমরা সবুজ পরিবহন নেটওয়ার্ক তৈরি করতে কাজ করছি।বিশেষ করে বড় বড় শহরগুলোতে তার দূষণ নির্গমন জন্য পরিচিত ক্ষেত্রগুলিকে পরিশোধনের জন্য দ্রুতবেগে কাজ করছি।

ভারতেনির্মিত হচ্ছে পরবর্তী প্রজন্মের অবকাঠামো, যেমন গণ পরিবহন ব্যবস্থা, গ্রিন হাইওয়ে এবং নৌপথ। ই-মবিলিটি ইকোসিস্টেম নামক একটি জাতীয় বৈদ্যুতিক গতিশীলতা পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে, যার লক্ষ্য ভারতের রাস্তায় সমস্ত যানবাহনের ৩০% এর বেশি যেন বৈদ্যুতিক হয়।

যেহেতু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকা দেশগুলির মধ্যে ভারতের অবস্থান, তাই এই উদ্যোগগুলি আমাদের নিজেদের ভালোর জন্যই গ্রহণ করা হয়েছে।

আমরা স্বীকার করি, এখনও অনেক দীর্ঘ পথ যেতে হবে। তবে এই প্রচেষ্টাগুলির সুফল ইতিমধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। ২০০৫-২০১৪ সময়কালে ভারতের কার্বননিঃসরণের তীব্রতা ২১% কমেছে। পরের দশকে আমরা আরও অনেকটা কমিয়ে আনার প্রত্যাশা করছি।

ভারত জলবায়ু ক্ষেত্রের দায়িত্বশীল বিশ্ব নাগরিক হতে আগ্রহী। আমরা কেবল আমাদের প্যারিস চুক্তির প্রতিশ্রুতিগুলি ছাড়িয়ে যাচ্ছি না। আমরা জলবায়ু কর্মে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও এগিয়ে নিতে নানান উদ্ভাবনী ব্যবস্থা গ্রহণ করছি।

আমরা ‘ইন্টারন্যাশনাল সোলার অ্যালায়েন্স’ এবং ‘কোয়ালিশন ফর ডিজাস্টার রেসিলিয়েন্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার’-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা তৈরি করেছি, যেগুলি কার্বন হ্রাসের জন্যবৈশ্বিক পথ তৈরিতে কাজ করছে। ৮০ টিরও বেশি দেশ ইন্টারন্যাশনাল সোলার অ্যালায়েন্স-এ যোগ দিয়েছে, যার ফলে এটিপরিণত হয়েছে দ্রুত বর্ধমান আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিরএকটিতে।

জাতীয় পদক্ষেপ এবং দায়িত্বশীল আন্তর্জাতিক নাগরিকত্বের এই সমন্বয় ভারতকে উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে অনন্য করে তুলেছে; এবং এটি জলবায়ু সম্পর্কে চিন্তাভাবনা এবং কার্যক্রমে নেতৃস্থানীয় হয়ে ওঠার উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে উপলব্ধি করার জন্য সঠিক কক্ষপথে রেখেছে।

***

হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা ভারতের পররাষ্ট্রসচিব। প্রকাশিত মতামত তাঁর ব্যক্তিগত।