অনেক কিছুই তো পেলাম সাকিবদের কাছ থেকে

একটা সময় ছিল যখন এমসিসির বুড়ো শৌখিন ক্রিকেটারদের সঙ্গে খেলেই আমরা বর্তে যেতাম। পশ্চিমবঙ্গ দলকেও অনেক শক্তিশালী মনে হতো। হায়দরাবাদ ব্লুজ কিংবা করাচি জিমখানা দলকে হারাতে পারলেও সেটিকে বিরাট সাফল্য বলে মনে করতাম। প্রথমে আমিনুল-আকরাম-মিনহাজুলদের হাত ধরে দিন বদলাল। সাকিব-মুশফিক-তামিম-মোস্তাফিজ-মাশরাফিরা বাংলাদেশের ক্রিকেটকে নিয়ে গেলেন অন্য উচ্চতায়। এখন বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে না উঠতে পারাকে আমরা ব্যর্থতা বলি। গত কুড়ি বছরে ক্রিকেট অনেক এগিয়ে গেছে। ক্রিকেট আমাদের কম দেয়নি।

একটা সময় ছিল যখন এমসিসির বুড়ো শৌখিন ক্রিকেটারদের সঙ্গে খেলেই আমরা বর্তে যেতাম। পশ্চিমবঙ্গ দলকেও অনেক শক্তিশালী মনে হতো। হায়দরাবাদ ব্লুজ কিংবা করাচি জিমখানা দলকে হারাতে পারলেও সেটিকে বিরাট সাফল্য বলে মনে করতাম। প্রথমে আমিনুল-আকরাম-মিনহাজুলদের হাত ধরে দিন বদলাল। সাকিব-মুশফিক-তামিম-মোস্তাফিজ-মাশরাফিরা বাংলাদেশের ক্রিকেটকে নিয়ে গেলেন অন্য উচ্চতায়। এখন বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে না উঠতে পারাকে আমরা ব্যর্থতা বলি। গত কুড়ি বছরে ক্রিকেট অনেক এগিয়ে গেছে। ক্রিকেট আমাদের কম দেয়নি।

ভারতের কাছে ২৮ রানের বাংলাদেশের পরাজয়ে মনটা বেশ খারাপই হলো। গ্যাক্ করে একটা ক্ষোভও জমেছিল। জিতে তো গিয়েছিলামই, আরেকটু সচেতন হলেই তো তীরে এসে তরি ডুবত না। সৌম্য ওভাবে অনেক বাইরের বলে সপাটে ব্যাট না চালালেও পারতেন! মুশফিকেরই–বা কী দরকার ছিল ওভাবে সুইপ করার? আর গোটা বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান যদি ওভাবে ক্যাচ তুলে না দিতেন! সাইফউদ্দিনকে যদি আরও একটু সঙ্গ দিয়ে যেতে পারত সাব্বির কিংবা অধিনায়ক মাশরাফি! আর শুরুতে যে ক্যাচটা মিস হলো—ইশ্‌, এ জন্যই তো রোহিত শত হাঁকালেন!

এভাবে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ১০১টা দোষ খুঁজে বের বরা যায়। নিন্দার মুগুর দিয়ে তুলোধুনা করা যায়। হতাশার সাগরে হাবুডুবু খেয়ে শতবার আহা-উহু করা যায়। এতে কষ্টের বোঝা বাড়বে বই কমবে না। এর চেয়ে বরং বিপরীত দিক দিয়ে এগোই। এতে ক্ষোভ থাকবে না, হতাশা কমবে, গ্লানিও অনেকটা ধুয়ে যাবে। একজন সাধারণ দর্শক হিসেবে সরল দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে চাই, আমাদের ছেলেরা খুবই ভালো খেলেছে।

আশির দশক বা নব্বইয়ের দশকের অনেকটা সময়জুড়ে যে বাংলাদেশ বিশ্বকাপ ক্রিকেটে খেলছে—এমনটা কল্পনাই করত না, তারা আজ বেশ দাপটের সঙ্গেই বিশ্বসেরা দলগুলোর সঙ্গে টক্কর দিচ্ছে। এবারের বিশ্বকাপে পাকিস্তানের সঙ্গে খেলার আগ পর্যন্ত যে কয়টা ম্যাচ খেলেছে, সব কটিতেই কোমর কষে লড়েছে বাংলাদেশ। সাতটা খেলার মধ্যে যে চারটা হার, প্রতিটিতে লড়েই হেরেছে।

আশির দশকে এ দেশে ক্রিকেটের এমন মজবুত অবস্থান ছিল না। এক নম্বর খেলার আসনে ছিল ফুটবল। দেশজুড়ে ছিল আবাহনী-মোহামেডান উন্মাদনা। ক্রিকেট কিন্তু তখনো বারোমাসি খেলার পর্যায়ে যেতে পারেনি। ছিল শীতকালীন মৌসুমি খেলা। শহরকেন্দ্রিক এ খেলায় সাধারণত সচ্ছল ছেলেপুলেরাই খেলত। কারণ, ক্রিকেট সরঞ্জাম একটু ব্যয়বহুল বলে তুলনামূলকভাবে অসচ্ছল ঘরের ছেলেরা এ খেলায় আসত না। তাদের ক্রিকেটের দৌড় সীমাবদ্ধ ছিল টেনিস বল আর চেলাকাঠ বা এ ধরনের কোনো কাঠের টুকরা দিয়ে বানানো ব্যাটের মধ্যে। ওই সময় এখনকার মতো ছোটদের ব্যাট, বল, স্টাম্পও সহজলভ্য ছিল না।

ওই সময় সারা দেশের মানুষের একমাত্র আশা ছিল ফুটবল নিয়ে। না, বিশ্বকাপে বাংলাদেশ যাবে—এমন দুরাশা হয়তো কেউ করত না। তবে এশিয়ায় মধ্যে ভালো অবস্থানে থাকবে—এমন আশা অবশ্যই ছিল। কিন্তু ফুটবলকে বুক উজাড় করে ভালোবেসেও দেশের অগণিত মানুষ প্রত্যাশার কানাকড়িও পায়নি। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের ফুটবল দল বড় টুর্নামেন্টগুলোতে কখনোই উল্লেখ করার মতো ভালো কিছু করতে পারেনি। ফুটবলে প্রত্যাখ্যাত ম্রিয়মাণ দর্শক শেষে ক্রিকেটকেই বুক ভরা ভালোবাসা দিয়ে আঁকড়ে ধরে। এই ভালোবাসা বিফলে যায়নি। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রত্যাশার চেয়ে প্রাপ্তির পাল্লা বরং বেশিই।

যত দূর মনে পড়ে, ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপের পর ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। সেবারই প্রথম টিভিতে অন্যান্যবারের চেয়ে বেশ ঘটা করে বিশ্বকাপের ম্যাচ সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ওই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় পাকিস্তান। পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ওই সময় পাকিস্তান ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ছিলেন। সেমিফাইনাল ও ফাইনালে ইমজামাম–উল হক ঝোড়ো গতিতে ব্যাট চালিয়েই তারকা বনে যান। তখন দেখেছি, একজন রিকশাচালক বা মুদি দোকানি, যাঁর ক্রিকেট নিয়ে পূর্ব কোনো ধারণাই নেই, তিনিও কাজ ফেলে কোনো ক্লাব বা পাবলিক প্লেসে টিভির সামনে দাঁড়িয়ে খেলা দেখছেন, নিজের মতো করে ক্রিকেট নিয়ে মন্তব্য করছেন।

বিরানব্বইয়ের বিশ্বকাপের পরপরই ক্রিকেট নিয়ে আমাদের স্বপ্ন দেখার শুরু। সে বছরই নিয়ম করা হয়, আইসিসি ট্রফির শীর্ষ তিন দলকে বিশ্বকাপে সুযোগ দেওয়ার। ১৯৯০ সালে হল্যান্ডের আইসিসি ট্রফিতে তৃতীয় হওয়া বাংলাদেশের বিশ্বকাপের আশা জোরালো হয়ে ওঠে এ ঘোষণায়। বাংলাদেশের বিশ্বকাপ খেলার সম্ভাবনা আরও বেড়ে যায় ১৯৯২ সালেই আইসিসি ট্রফির মঞ্চে সে সময় বাংলাদেশের সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ের টেস্ট মর্যাদা নিশ্চিত হওয়ায়। ১৯৯০ আইসিসি ট্রফিতে জিম্বাবুয়ের কাছে হেরেই যে আশাভঙ্গ হয়েছিল বাংলাদেশের।

আমাদের বিপুল প্রত্যাশার আইসিসি ট্রফি ছিল ১৯৯৪ সালে। কেনিয়ায় অনুষ্ঠিত সে টুর্নামেন্টে শীর্ষ তিন দলের মধ্যে থাকার ব্যাপক প্রত্যাশা নিয়ে বাংলাদেশ অংশ নিয়েছিল। কিন্তু স্বপ্নটা সত্যি হয়নি। কেনিয়া, হল্যান্ড আর আরব আমিরাতের কাছে হেরে বিশ্বকাপের স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়ে বাংলাদেশের। ১৯৯৬ সালে ঘরের উঠানে আয়োজিত বিশ্বকাপে আমরা দর্শক হয়েই ছিলাম।

আমরা ব্যর্থ হয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু হতোদ্যম হইনি। ১৯৯৪ আইসিসি ট্রফির ব্যর্থতা আমাদের আরও সজাগ ও সচেতন করে তোলো। এর তিন বছরের ব্যবধানে ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জিতে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন পূরণ করে। আনন্দে মাতে গোটা দেশ। দেশজুড়ে সেদিন কী উন্মাদনা! রং ছোড়াছুড়ি, আনন্দ। সে আনন্দ আজও অমলিন। ১৯৯৯ সালে বিশ্বকাপে প্রথম সুযোগেই পাকিস্তানকে হারিয়ে বাংলাদেশ যখন সারা বিশ্বকে চমকে দিল, সেদিন রাতভর দেশজুড়ে উদ্‌যাপন হয়েছে। গরু-খাসি মেরে ভূরিভোজ হয়েছে। মিষ্টি বিতরণের হিড়িক পড়ে গেছে।

এর মধ্যে পেরিয়ে গেছে ২০টি বছর। এত দিনে বাংলাদেশ প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে আঁতুড়ঘর পেরিয়ে শৈশব-কৈশোর কাটিয়ে আজ টগবগে তারুণ্যে পৌঁছেছে। অস্ট্রেলিয়া, ভারত, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দলগুলোকে বাংলাদেশ এখন ছেড়ে কথা কয় না। এবারের বিশ্বকাপে প্রতিটি খেলাতেই এর প্রমাণ দিয়েছে বাংলাদেশ। এবার আমাদের প্রত্যাশা ছিল—মাশরাফির দল সেমিফাইনালে যাবে। তা যায়নি বটে, তবে পাওয়াটা কম নয়। সাকিব আল হাসান শীর্ষ অলরাউন্ডারের কাতারে এক নম্বরে গেছেন। ভারতের সঙ্গে খেলায় আমরা আরেকজন অকুতোভয় অলরাউন্ডারকে আবিষ্কার করলাম। তিনি মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। টর্পেডো ব্যাটিংয়ে ৫০ তুলে কী চমকটাই না দেখালেন! আর মোস্তাফিজকে দেখা গেছে আরেক রূপে। তাঁর কয়েকটি অসাধারণ কাটারে সেরা কয়েকজন ব্যাটসম্যানের উইকেট পড়েছে। ঝোলায় পুরেছেন পাঁচ-পাঁচটি উইকেট।

কয়েক দশক আগে, একটা সময় এমসিসি দল বাংলাদেশে এলে কী সাড়াই না পড়ে যেত। অথচ সেই দলের অনেক ক্রিকেটার ছিলেন বর্ষীয়ান শৌখিন খেলোয়াড়। তখন সারা দেশের মানুষের জন্য খেলা দেখার বিষয়টি অবারিত ছিল না। ছিল বেতারের ধারা বিবরণীনির্ভর। প্রয়াত ভাষ্যকার আবদুল হামিদ (হামিদ ভাই বলে পরিচিত), মঞ্জুর হাসান মিন্টু প্রমুখ যখন উত্তেজিত কণ্ঠে রকিবুল হাসান, রফিকুল আলম বা ইউসুফ বাবুর চার মারার বর্ণনা দিতেন, আনন্দের শিহরণ বয়ে যেত ক্রিকেটপাগল শ্রোতার হৃদয়ে। ভারত থেকে আসা পশ্চিমবঙ্গ ক্রিকেট দল বা হায়দ্রাবাদ ব্লুজকে হারানো ছিল স্বপ্নর বিষয়। আর টেস্ট খেলিয়ে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে টক্কর দেওয়ার কথা ভাবাই যায় না। আজকের মাশরাফি-সাকিবরা সেই দৈন্য ঘুচিয়ে আমাদের অনেক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তাঁদের পথ ধরে ভবিষ্যৎ ক্রিকেটাররা নিশ্চয়ই বাংলাদেশকে উন্নতির আরও শিখরে নিয়ে যাবে। আমরা তখন সেমিফাইনাল নয়, দেখব বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন। জয় আমাদের হবেই।