অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খানের শুভ জন্মদিন আজ

31
Social Share

আজ রবিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান স্যারের জন্মদিন। আধুনিক, সংস্কৃতিমনা, বন্ধুবৎসল, চমৎকার এই মানুষটি আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন। শুভ জন্মদিন স্যার।

অধ্যাপক কামরুল হাসান খান স্যার এক কথায় অসাধারণ একজন মানুষ। বিএসএমএমইউ-র ভিসি থাকাকালীন উনার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। ২০১৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর আমাদের কন্যা উমামাহ্ রহমান কথামনির জন্ম হয়েছিল বিএসএমএমইউ’র গাইনি বিভাগে সিজারিয়ান সেকশান অপারেশনের মাধ্যমে। তখনো স্যারের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি, তেমন পরিচয়ও নেই। কিন্তু সিজারের পর দেখলাম, গাইনি বিভাগের বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক তৃপ্তী দাস ম্যাডামকে ফোন করে কে যেন বেবী ও মায়ের খোঁজ নিচ্ছেন। পরে জানলাম, তিনি স্বয়ং সেখানকার ভিসি কামরুল স্যার। এটি আমার কাছে ইতিহাস। আমাদের আনন্দ তখন অনেকগুণ বেড়ে গিয়েছিল। পরে এক দিন স্যারের সঙ্গে দেখা করি।

একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত স্যার বিএসএমএমইউ’র যথেষ্ট উন্নয়ন সাধন করে গেছেন। তাঁর আমলে মেডিক্যাল শিক্ষা, চিকিৎসা, গবেষণা ছাড়াও যতগুলো অবকাঠামোগত যা উন্নয়ন হয়েছে তা ইতিহাস হয়ে থাকবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বেহাত যাওয়া প্রচুর জমি উদ্ধারে প্রাণ গোপাল স্যারের ভূমিকাও রেকর্ড হয়ে থাকবে। এর পরবর্তী ভিসি হিসেবে কামরুল স্যার দায়িত্ব নেন। চিকিৎসা ও শিক্ষায় শীর্ষ হিসেবে গড়ে তোলার প্রাণপণ চেষ্টা ছিল কামরুল স্যারের। উনার সময়ে প্রচুর গবেষণা হতো; যথেষ্ট ফান্ডেরও ব্যবস্থা করেছিলেন এবং ডেকে ডেকে গবেষণা ফান্ড বিতরণ করতেন। মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়টিতে প্রচুর সময় দিতেন। প্রতিটি রোগী সঠিক চিকিৎসা ও সেবা পাচ্ছে কিনা তার খোঁজ রাখতেন। তিনি নিয়ম করে দুই বেলা রাউন্ডে বের হতেন। রোগীদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। আমার জানা মতে, এই পরিদর্শনটি তখন খুব জোরালো ছিল এবং প্রতিদিন দুইবার রাউন্ড হতো। চিকিৎসক, নার্সদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলে সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে নির্দেশনা ছিল তাঁর। স্টাফদের কাজের তদারকি নিজে করতেন। তার সময়ে নার্স কর্তৃক রোগীদের ওষুধ খাইয়ে দেওয়ার নিয়মও চালু ছিল। যথেষ্ট উন্নয়ন করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি, ক্যান্টিনের। এই মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়টি বিশ্বের নামকরা প্রতিষ্ঠান হিসেবেও স্বীকৃতি পায়।

এক দিন রাত ১২টার দিকে তৎকালীন যুগ্ম সম্পাদক তৌহিদুর রহমান ভাই অর্থোপেডিক চিকিৎসকের খোঁজে আমাকে ফোন দিলেন। আমি তাকে পাঠালাম বিএসএমএমইউ’র অর্থোপেডিক ইমার্জেন্সি বিভাগে। ওই সময় অর্থোপেডিক, গাইনিসহ চারটি বিভাগ ২৪ ঘণ্টাই খোলা থাকত। তৌহিদ ভাই সেখানে গেলেন এবং এতো রাতে যথেষ্ট চিকিৎসা সেবা পেলেন। এতো রাতে স্বয়ং ভিসি কামরুল স্যার, তৎকালীন হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহ হারুন স্যার ও তার টিমের লোকজনকে নিয়ে হাসপাতাল পরিদর্শন করছেন—এ দৃশ্য দেখে তৌহিদ ভাই অবাক হলেন এবং বিষয়টি আমাকে শেয়ার করলেন। আমি বললাম, তিনি এটা নিয়মিতই করে থাকেন।

কামরুল স্যারকে এক দিন বললাম, আপনি কিছু অভিযোগ বক্স বিভিন্ন জায়গায় টাঙ্গিয়ে দেন যাতে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ পেয়ে আরো পদক্ষেপ নিতে পারেন। কেননা চিকিৎসা ও সেবা নিয়ে কারোর অভিযোগ থাকলেও কেউ সহজে অভিযোগ করতে চায় না। যে কথা সেই কাজ। কয়েকদিন পর দেখি, বিভিন্ন বিল্ডিংয়ের কোনায় কোনায় দান বাক্সের মতো অভিযোগ বক্স ঝুলছে!

৭ মাসের গর্ভবতী এক নারী আজিমপুর ম্যাটারনিটি হয়ে বিএসএমএমইউ’র গাইনি ইমার্জেন্সিতে যায় দুপুরের দিকে। গর্ভবতীর পানি ভেঙ্গে যায় অথচ সিট খালি থাকার পরও ভর্তি নিচ্ছিল না রেড ইউনিটের ডিউটি ডাক্তার। তারা ঝামেলা মনে করে রেফার করে দেয় ঢাকা মেডিক্যালে। ভিসি স্যারকে আমি বিষয়টি জানালে অনেক রাতে ভর্তি নেওয়া হয়। দুঃখজনক যে, দুপুর থেকে ভর্তি হওয়া অপেক্ষায় থাকা গর্ভবতীটি রাত ১টার পর মৃত বাচ্চা প্রসব করেন; প্লাসেন্টা বা গর্ভফুল আটকে গিয়ে ঝুঁকিতে পরে নারীটিও। বিষয়টি নিয়ে রাতেই ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দেই। স্ট্যাটাস দেখে পর দিন সকালে কামরুল স্যারের নির্দেশে রীতিমতো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তীতে ঘটনার প্রমাণ সাপেক্ষে বিধি মোতাবেক দায়ীদের শাস্তিও প্রদান করা হয়। এই ছিলেন সাবেক ভিসি কামরুল স্যার।

ভিসি থাকাকালীন স্যারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ হতো। শাহবাগে গেলে স্যারের সঙ্গে দেখা না হলে কী যেন অপূর্ণ থাকতো। দেখা করতে গিয়ে বেশ সময় কাটাতাম, নানা গল্পগুজব করতাম। ভিসি স্যারের রুমটাকে মনে হতো নিজের রুম। এখনো শাহবাগে গেলে মনটা খারাপ হয়ে যায়, দারুণভাবে মিস করি সেই দিনগুলো। কালের কণ্ঠ’র প্রতিটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দীর্ঘ যানজট পেরিয়ে কামরুল স্যার দলবলসহ আসতেন ফুল নিয়ে। এখন স্যারের সঙ্গে কালে ভদ্রেও দেখা হয় না।

গুণী এই মানুষটির দীর্ঘায়ু ও সমৃদ্ধ জীবন কামনা করছি। ভালো থাকুন প্রিয় স্যার।

লেখক : স্বাস্থ্যবিষয়ক সাংবাদিক