খালেদার দাবি সংবিধানবহির্ভূত বাস্তবায়ন সম্ভব নয়

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ‘নিরপেক্ষ সরকারের’ অধীনে নির্বাচন এবং সেই নির্বাচনে বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে সেনা মোতায়েনের যে দাবি জানিয়েছেন, তা সংবিধানবহির্ভূত হওয়ায় বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলে অভিমত দিয়েছেন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা। তাঁরা বলেছেন, খালেদা জিয়া সংবিধানবহির্ভূত প্রস্তাব দেওয়ায় জাতি উদ্বিগ্ন ও আশাহত।

সংবিধানের বাইরে নানা প্রস্তাব দিয়ে খালেদা জিয়া প্রমাণ করছেন তাঁরা এখনো গতবারের মতো নির্বাচন বানচালের পথে হাঁটছেন।

গতকাল রবিবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপির জনসভায় খালেদা জিয়া বলেন, ‘শেখ হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না, হতে পারে না। প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ কমিশনারদের বলব, দেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করার দায়িত্ব আপনাদের। আপনারা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের কথা বলুন। ’ তিনি নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন এবং তাদের বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ারও দাবি জানান।

আওয়ামী লীগ নেতাদের মতে, দেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করার দায়িত্ব যে নির্বাচন কমিশনের, খালেদা জিয়ার বক্তব্যে এই উপলব্ধি ইতিবাচক। বিএনপির উচিত হবে এই বিশ্বাস ধারণ করেই এগিয়ে চলা। তাহলে আগামী নির্বাচন নিয়ে বিএনপির দোদুল্যমানতা কাটবে।

খালেদার বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচনে সেনা মোতায়েন করা না করা সরকারের এখতিয়ার নয়।

এটি নির্বাচন কমিশনের বিষয়। সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পরিচালনা করবে। এখন আমরা সেনাবাহিনী মোতায়েন চাই বললে তো হবে না। নির্বাচন কমিশন প্রয়োজন মনে করলে সেনা মোতায়েন করবে। ’ তিনি বলেন, ‘বিএনপির দাবি জানাতে হবে সংবিধানের মধ্যে থেকে। যা হবে আইনের মধ্যেই হবে। কারো কোনো দাবি অনুযায়ী কিছু হবে না। এখানে আমাদেরও দাবির কিছু নেই, তাদেরও দাবির কিছু নেই। এটা করতে হবে, ওটা করতে হবে, বললে তো হবে না। আইনের বাইরে কারো কিছু করার ক্ষমতা নেই। আর খালেদা জিয়া সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার দাবি তুলছেন কেন? এটার পেছনে নিশ্চয় দুরভিসন্ধি আছে। তাদের কি জনগণের ওপর ভরসা নেই? জনগণ পক্ষে থাকলে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দরকার কী?’

জনসভায় বাধা দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘মিটিংয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বাধা দেওয়া হয়নি। বাস চালানো, না চালানো বাস মালিকদের ব্যাপার। আর মিটিংয়ে বাধা দেওয়ার রেকর্ড বিএনপির আছে, আমাদের নেই। ২০০১ সালের পর আমাদের সব কর্মসূচি পালন করতে হয়েছে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে। রাজপথে আমিসহ অনেক সিনিয়র নেতা পুলিশের হামলার শিকার হয়েছেন। আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে কাঁটাতারের ব্যারিকেড থাকত। কোনো মিটিং করতে দেওয়া হতো না। এসব ভুলে গেলে চলবে না। এখন তারা মিটিংয়ে বাধা দেওয়ার কথা বলছে। আসলে ওদের মিথ্যাচারের স্বভাব। সেই স্বভাববশতই বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে। ’

বিএনপির সমাবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘এটা খতিয়ে দেখতে হবে, খোঁজ নিতে হবে বাধাটা কে দিচ্ছে। বিএনপি তো নিজেরাই নিজেদের বাধা দেয়। অতীতে এসব অভিযোগের খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ওসব অভিযোগের বাস্তব কোনো ভিত্তি নেই। আসলে কথায় কথায় নালিশ করা বিএনপির পুরনো অভ্যাস। ’

নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে বিএনপির দাবি প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘সরকার কি সহায়ক, নাকি তত্ত্বাবধায়ক? তারা একবার বলে সহায়ক সরকার, আবার বলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার। আসলে তারা কী চায়, তা কি আজ পরিষ্কার করবেন খালেদা জিয়া? তারা কী চায়, দেশের জনগণ তা জানতে চায়। কথা তো পরিষ্কার, সহায়ক ও তত্ত্বাবধায়ক তো মামাবাড়ির আবদার না। আওয়ামী লীগ সংবিধানের বাইরে যাবে না। ’ গতকাল দুপুরে রাজধানীর একটি রেস্তোরাঁয় জাতীয় সড়ক পরিবহন নিরাপত্তা কাউন্সিলের ২৫তম সাধারণ সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের এসব কথা বলেন।

নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘নির্বাচন হবে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অধীনে, সারা পৃথিবীর অন্য দেশগুলোতে যেভাবে হয় সেভাবে। সে সময় যে সরকার থাকবে, তারা ইসিকে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে সহায়তা দেবে। ’

নির্বাচনে বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আওয়ামী লীগও নির্বাচনে সেনাবাহিনী চায়। তবে সেটা আইন অনুযায়ী। খালেদা ১০ বছরের মতো প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে কয়টা নির্বাচন করেছেন?’ তিনি আরো বলেন, খালেদা জিয়ার বক্তব্য শেখ হাসিনার প্রতি তাঁর আক্রোশের বহিঃপ্রকাশ। গতকাল সন্ধ্যায় ধানমণ্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে খালেদা জিয়ার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। খালেদা জিয়ার সংবিধানবহির্ভূত দাবি বাস্তবসম্মত নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন হবে। নির্বাচন কমিশন আইন অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনা করবে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশন চাইলে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে পারবে। কিন্তু খালেদা জিয়ার সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের সেনাবাহিনী আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। তারা তাদের দায়িত্ব পালনে খুবই সক্ষম। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তারা দায়িত্ব পালন করে সুনাম অর্জন করেছে। আমাদের এখানেও অনেক দুর্যোগ মোকাবেলায় তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাই বলে তাদের বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয়। ’

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শেখ হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়, খালেদা জিয়ার এমন বক্তব্যে আমরা আশাহত। তাঁরা নির্বাচন ভণ্ডুলের পক্ষে কথা বলেছেন। কারণ সংবিধানের বাইরে গিয়ে নির্বাচন সম্ভব নয়। আগামী নির্বাচন হবে সংবিধানসম্মতভাবেই। খালেদা জিয়ার সংবিধানবহির্ভূত প্রস্তাবে জাতি উদ্বিগ্ন। ’ নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে মোতায়েনের দাবি প্রসঙ্গে আবদুর রহমান বলেন, ‘সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমাদের সংবিধানে সেনাবাহিনীর কর্মপরিধি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এখন তাদের বিচারিক ক্ষমতা দিলে তা সংবিধানসম্মত হবে না। ’

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘খালেদা জিয়া আজকে যে ভাষণ দিয়েছেন, তা বিএনপির আজকের অবস্থান হিসেবে ধরে নেওয়াই ভালো। কারণ আগামীকাল তারা এ বক্তব্যে স্থির থাকবে, এটা বলা মুশকিল। গত কয়েক বছরে তারা বহুবার তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে। ’ তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া তাঁর বক্তব্যে বলেছেন একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। এটিই হলো বাস্তবতা। নির্বাচন কমিশনই নির্বাচন পরিচালনা করে থাকে, সরকার নয়। তবে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নির্বাচন কমিশনের কাজের এখতিয়ার সম্পর্কে ধারণা থাকা উচিত। তিনি নির্বাচন কমিশনারদের একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য সরকারকে বলতে বলেছেন। আইন অনুযায়ী সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশন এটি বলতে পারে না। এটি খালেদা জিয়ার নিছক মেঠো বক্তব্য। ’

স্বপন আরো বলেন, ‘নির্বাচনে প্রয়োজন হলে আমরাও সেনা মোতায়েনের পক্ষে। কিন্তু জিয়াউর রহমান যেভাবে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করেছেন, খালেদা জিয়া যেভাবে বারবার সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে আমাদের গর্বের প্রতিষ্ঠানটিকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছেন, এটা কাম্য নয়। সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের চেষ্টা পরিহার করা উচিত। ’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *